নাস্তিকতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
নাস্তিকতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ৭ জুন, ২০২৪

ঈশ্বরের অনস্তিত্বের প্রমাণ সমূহ

"ঈশ্বর যে নেই" - তার প্রমাণ কী? 

 এমন প্রশ্ন অনেক ঈশ্বর-বিশ্বাসী মানুষকেই করতে শুনি। বিভিন্ন সময়ে এর জবাবে বার্ডেন অব প্রুভের যুক্তি নিয়ে এসেছি, তারপরেও ঈশ্বর-বিশ্বাসীরা দমে যান না, রায় ঘোষণার মত বলে দেন, ঈশ্বরকে প্রমাণ যেমন করা যায় না, অপ্রমাণও করা যায় না। বস্তুত তিনি প্রমাণ-অপ্রমাণের উর্ধ্বে একটা সত্ত্বা। একমাত্র অবাস্তব - অলীক - কাল্পনিক কোন কিছুই যে প্রমাণ-প্রমাণের অতীত হতে পারে, সেটি অবশ্য তারা বুঝতে পারে না বা মানতে চায় না! যাই হোক, আমি সংশয়বাদী নই, আমি নাস্তিক। মানে কেবল ঈশ্বরের অস্তিত্বের ব্যাপারে সন্দিহানই নই, আমি ঈশ্বরের অনস্তিত্বের ব্যাপারে নিশ্চিত। সে কারণে, ঈশ্বরের অনস্তিত্বের প্রমাণাদি দেয়াটাও আমি কর্তব্যজ্ঞান করি বিধায়, সেই প্রমাণগুলোর একটা তালিকা তৈরিতে আগ্রহী হয়েছি। সেই তালিকাটিই এক্ষণে পাঠকদের সাথে শেয়ার করতেই বর্তমান লেখাটি লিখছি।

১। ঈশ্বর নামে কোন কিছুর দেখা পাইনি বা অন্য কেউ কোনকালে দেখেছে বলে প্রমাণও করতে পারেনি, জীবনে তার অস্তিত্ব অনুভব করিনি, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোন ঘটনার ব্যাখ্যায় ঈশ্বরের উপস্থিতির দরকার পড়েনি। অতএব, প্রমানিত হলো যে, ঈশ্বর বলে কিছু নেই।

২। এই যে আমি সহ দুনিয়ার অসংখ্য মানুষ বলছি, ঈশ্বর নেই, কিন্তু ঈশ্বর কিছু করতে পারছেন না। শুধু ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকারই নয়, অনেকেই ঈশ্বরকে নিয়ে হাসি-তামাশা, গালাগালি যা ইচ্ছে করছে, এমনকি দুনিয়ার ঈশ্বরবিশ্বাসীরাও যুগে যুগে নিজ নিজ কল্পনা মোতাবেক ঈশ্বরকে নিয়ে ইচ্ছে মত গল্পকথা, কিচ্ছা কাহিনী ফেঁদেছে, একে কাহিনীর সাথে আরেক কাহিনী কেবল বিপরীতই নয়, বিরোধাত্মকও। তারপরেও, ঈশ্বরের তরফ থেকে কোন রকম কোন উদ্যোগ দেখা যায় না! অতএব, প্রমানিত হলো যে, ঈশ্বর বলে কিছু নেই।

৩। দুনিয়ার যতগুলো ধর্মের যতসব ঈশ্বর আছে, তার একটি বাদে বাঁকিগুলো সবসময়ই ভুল এবং ভুয়া বলে ধর্মগুলো মনে করে ও প্রচার করে। মানে, কেবল নিজ ধর্মের ঈশ্বর সঠিক, বাঁকি সব ঈশ্বর ভুল। বস্তুত নিজ ধর্মের ঈশ্বরটিকে সঠিক মনে করা মানুষের চাইতে সেটিকে ভুল ও ভুয়া মনে করা মানুষের সংখ্যাই দুনিয়ায় সবসময় সবচেয়ে বেশি। সবযুগের, সব ধর্মের ধর্মের ঈশ্বরের ক্ষেত্রেই দেখা যাবে, তাকে অবিশ্বাস করা মানুষই বিপুলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ। অতএব, প্রমানিত হলো যে, ঈশ্বর বলে কিছু নেই।

৪। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যা কিছু অস্তিত্বশীল, তার ব্যাপারে দুনিয়ার মানুষ নিশ্চিতভাবে জানতে পারে, ফলে একেক জায়গার, একেক সমাজের মানুষের কাছে সেটি একেক রকম হয় না। নিজ চোখে কখনো সরাসরি না দেখা (ছবিতে বা ভিডিওতে দেখা) মরু অঞ্চলের সাদা ভাল্লুক, দুনিয়া থেকে খালিচোখে দেখতে না পারা সৌরজগতের গ্রহ নেপচুন বা তার উপগ্রহ সমূগ, কিংবা অদৃশ্য বাতাস ও বাতাসে থাকা অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, কার্বন ডাই অক্সাইড - থেকে শুরু করে যা যা কিছু অস্তিত্বশীল, তার ব্যাপারে দুনিয়ার যেকোন প্রান্তের মানুষের মাঝে কোন রকম মতভিন্নতা নেই, সেসবের অস্ত্বিত্বের ব্যাপারে নানারকম কিচ্ছাকাহিনীও প্রচলিত নেই। আবার, যা কিছুর বাস্তবে কোন রকম অস্তিত্ব নেই, কিন্তু মানুষের কল্পনায় পেখম মেলেছে - তাদের সম্পর্কে গোটা দুনিয়ার নানা রকম কাহিনী, কিচ্ছা পাওয়া যায়। দুনিয়ায় হাজার - লক্ষ রকমের দৈত্য-দানব রয়েছে, লক্ষ লক্ষ ড্রাকুলা, রাক্ষস-খোক্ষস রয়েছে, , জ্বিন-পরী রয়েছে কোটি রকমের ভূত রয়েছে। যে যেমন কল্পনা করবে, সেরকমই ভূত তৈরি হবে। কবি সাহিত্যিক, রূপকথা-লেখক কল্পনায় কথা বলতে পারা পশুপাখি, মানুষের মত দালান-কোঠায় বাস করা, কাপড়-চোপড় পরা, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত জন্তু-জানোয়ারের গল্প বলেন, লিলিপুট - গালিভারের গল্প শোনান, এলফ - হোবিট কিংবা নেকড়ে-মানুষ, বাদুড়-মানুষ, উড়ন্ত মানুষ, বিদ্যুতের গতিতে ছুটতে পারা মানুষ, প্লাস্টিক-মানুষ, মৃত-সচল-মানুষ- এমন অসংখ্য "জিনিস" এর গল্প শোনান। এর সব কিছুই কাল্পনিক। একইভাবে দেবতা, দেবী গোটা দুনিয়া জুড়েই যুগে যুগে বিভিন্ন রকম, ব্যাপক বৈচিত্রপূর্ণ। ঈশ্বরের ধারণার মাঝেও আছে এই বিশাল - বিপুল বৈচিত্র, কার দেব-দেবী বা ঈশ্বর শ্রেষ্ঠ, তা নিয়ে মানুষে মানুষে কম মারামারি - হানাহানিও হয়নি! এসব কিছুই আসলে মানুষের কল্পনাজাত। অতএব, প্রমানিত হলো যে, ঈশ্বর বলে বাস্তবে কিছু নেই।

৫। বস্তুত, কোন কিছুর অস্তিত্ব আছে বলে যেই একটা দাবি তুলে, এটা তারই দায়িত্ব যে - সেটার অস্তিত্ব প্রমাণ করা। প্রমাণ করতে না পারলে, অটোমেটিক সেই দাবি খারিজ হয়ে যায়, অর্থাৎ দাবির সেই "কোন কিছু"র অনস্তিত্ব প্রমাণিত হয়ে যায়। আজ পর্যন্ত যারাই দাবি করেছে যে, ঈশ্বর আছে; তাদের কেউই ঈশ্বরের কোন রকম নিশ্চিত প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। অতএব, প্রমানিত হলো যে, ঈশ্বর বলে বাস্তবে কিছু নেই।

৬। গাণিতিকভাবে বা যুক্তবিদ্যায় আমরা জানি যে, কোন একটা দাবির স্বপক্ষে দেয়া যুক্তিকে ভুল দেখানোর মাধ্যমেও - সেই দাবিকে ভুল প্রমাণ করা যায়। যেমনঃ জ্যামিতির উপপাদ্য প্রমাণের ক্ষেত্রে দেখা যায়, উপপাদ্যের বিপরীত সিদ্ধান্তটি যদি ভুল দেখানো যায়, তাহলে উপপাদ্যটি প্রমানিত হয়ে যায়। যেমনঃ "একটি বিষমবাহু ত্রিভুজের তিনটি কোণের কোনটাই কোনটার সমান নয়" - এটি প্রমাণের জন্যে প্রথমে বিপরীত একটি দাবি ধরে নেয়া যাক। মানে, বিষমবাহু ত্রিভুজের যেকোন দুটি কোণ সমান ধরে নিলে দেখা যাবে, ঐ দুই সমান কোণের বিপরীত দুই বাহু সমান হবে, তিনটি কোণ সমান হলে দেখা যাবে (দুটি দুটি কোণ ধরে প্রমাণ করা সম্ভব) ত্রিভুজটির তিনটি বাহু সমান। যেহেতু বিষমবাহু ত্রিভুজ, অর্থাৎ তার তিনটা বাহুই অসমান। ফলে, বিপরীত সিদ্ধান্তটা ভুল প্রমাণ হলো, তার অর্থই হচ্ছে, মূল উপপাদ্যটি প্রমানিত হলো, মানে বিষমবাহু ত্রিভুজের তিনটি কোণের কোনটাই কোনটার সমান নয়! একইভাবে, আজ পর্যন্ত ঈশ্বরের প্রমাণে যত যুক্তি প্রদান করা হয়েছে, বা ঈশ্বর সম্পর্কে যা যা বলা হয়েছে, সবই আসলে ভুল বা অযৌক্তিক হিসেবে প্রমানিত হয়েছে। সেখান থেকেও বলা যায়, ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষের যুক্তি ও ব্যাখ্যাগুলোর বেঠিকতা ও অসারতাই ঈশ্বরর অনস্তিত্বের প্রমাণ। অতএব, প্রমানিত হলো যে, ঈশ্বর বলে বাস্তবে কিছু নেই।

ক) "ঈশ্বর সমস্ত কিছুর সৃষ্টিকর্তা": তিনি কি তবে নিজেকেও সৃষ্টি করেছেন? ঈশ্বরের যদি সৃষ্টি না হয়ে থাকে, তিনি যদি অনাদি ও অনন্তকাল ধরে বিরাজমান হতে পারেন, তাহলে ঐ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডেরও অনাদি ও অনন্তকাল ধরে বিরাজমান হতে অসুবিধা কোথায়? সেখানেই বস্তু ও শক্তিজগৎ কেবল রূপান্তরিত হচ্ছে, কোথাও বিগ ক্রাঞ্চ হচ্ছে, কোথাও বিগ ব্যাং এর মাধ্যমে কোন ইউনিভার্সের যাত্রা শুরু হচ্ছে - এ সবই প্রাকৃতিক নিয়মের অধীনে, প্রাকৃতিকভাবেই কোন সৃষ্টিকর্তা বাদেই তো হতে পারে। আর, সবকিছুর সৃষ্টির জন্যে সৃষ্টকর্তা আবশ্যক হবেই - তাহলে সেই সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরের পক্ষেও অনাদি-অনন্তকাল বিরাজ করা সম্ভব নয়, তারও সৃষ্টিকর্তা কেউ না কেউ আছেন, সেই সৃষ্টিকর্তার আবার আরেকজন সৃষ্টিকর্তা আছেন, সেই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিকর্তা, তার সৃষ্টিকর্তা এভাবে পিতা - পিতামহ - প্রপিতামহ যেতে যেতে চেইনের শেষটা কোথায় পাওয়া যাবে? অতএব, প্রমানিত হলো যে, ঈশ্বর বলে বাস্তবে কিছু নেই।

খ) "জীবের মৃত্যু ঘটান ঈশ্বর, সমস্ত কিছু ধ্বংসও করবেন ঈশ্বর" : তবে কি তিনি নিজেকেও ধ্বংস করবেন? আর, বস্তু ও শক্তি অনিত্য, মানে তার ধ্বংস বা বিনাশ নেই, কেবল রূপান্তর আছে। মানুষ সব জীবের মৃত্যুও আসলে ধ্বংস বা বিনাশ নয়। মৃত শরীর পঁচে ডিকম্পোস্ট হয়ে কিছু অংশ বাতাসের অক্সিজেনের সাথে মিলে কার্বন ডাই অক্সাইড হয়, আর বাঁকি অংশ মাটির সার হয়ে উর্বরতা বাড়ায়, স্তরে স্তরে জমা মাটির গভীরে জমা হতে হতে অনেক বছর পরে জীবাশ্ম জ্বালানি (তেল, গ্যাস, কয়লা) হয়। আর, জীবের কোষগত মৃত্যুর জন্যেও কোন ঈশ্বরের দরকার আসলে নেই, জৈবিক কারণে ও জৈবিক উপায়েই সেগুলোর মৃত্যু ঘটে। অতএব, প্রমানিত হলো যে, ঈশ্বর বলে বাস্তবে কিছু নেই।

গ) "ঈশ্বর সর্বশক্তিমান": ঈশ্বরের কি সেই পরিমাণ শক্তি আছে, যা দিয়ে তিনি নিজেকে পরাজিত করতে পারবেন? এই যুক্তিটিকে ফ্যালাসি মনে হতে পারে, কিন্তু "সর্বশক্তিমান" বা সুপ্রিম পাওয়ার বলে আসলে যে কোন কিছুই থাকতে পারে, সেটা বুঝার জন্যে এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালীর ধারণামাত্রই আপেক্ষিক, কাউকে অন্যের চাইতে শক্তিশালী বলা যেতে পারে, এমনকি অন্য সকলের চাইতে শক্তিশালী বলা যেতে পারে, কিন্তু "সর্বশক্তিমান" বলা যায় না। আরেকটা প্রশ্নও করা যেতে পারে, ঈশ্বর কি এমন কোন পাথর তৈরি করার মত শক্তি বা সামর্থ্য রাখেন, যেই পাথর তিনি নিজে তুলতে পারবেন না? এই প্রশ্নও দেখিয়ে দেয় যে, আসলে "সর্বশক্তিমান", "সব কিছুই পারেন" - এই দাবিগুলো প্রচণ্ডরকম ভুল ও ভুয়া। বস্তুত "সর্ব" বাদ দিয়ে ঈশ্বরকে বিপুল - বিশাল শক্তিমান হিসেবে দাবি করলেও - আসলে সেটাকে নিমিষেই অপ্রমাণ করে দেয়া যায়! ঈশ্বরকে যেকোন জায়গা থেকেই যেকেউ যেকোন চ্যালেঞ্জ জানালেই দেখা যাবে, কোন কিছুই বস্তুত করতে সক্ষম নন। ঈশ্বর কি এখন আমার হাত থেকে ল্যাপটপ নিয়ে আছাড়া দিয়ে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দিয়ে- এসব ঈশ্বরবিরোধী লেখা থেকে আমাকে বিরত রাখতে পারবেন? কিংবা আমার হাতকে প্যারালাইজ করে, আমার তাৎক্ষণিক মৃত্যু ঘটিয়ে এই পোস্ট দেয়া থেকে বিরত রাখতে পারবেন? সেই শক্তি, সামর্থ্য তার আছে? এরকম প্রতিটা মানুষই ইচ্ছেমত চ্যালেঞ্জ দিয়ে দেখতে পারে! প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে কোন কাজই এই বিপুল শক্তিমান ঈশ্বরের নেই। অতএব, প্রমানিত হলো যে, ঈশ্বর বলে বাস্তবে কিছু নেই।

ঘ) "ঈশ্বর আছেন বলেই, এই বিশ্বজগৎ এত সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হচ্ছে": আমাদের দুনিয়াতেই যে এত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঝড় - বন্যা - ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, সুনামিতে সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয় যখন, তখন কি ঈশ্বর ছুটিতে থাকেন? বিশ্বজগতটা মোটেও সুশৃঙ্খল নয়, বরং প্রচণ্ড রকম বিশৃঙ্খল (chaotic)। আজকে আমাদের সৌরজগতের গ্রহগুলো সূর্যের চারদিকে এবং, উপগ্রহগুলো গ্রহের চারদিকে বিচরণ করছে, কোথাও কোন সংঘর্ষ হচ্ছে না, পৃথিবীর আহ্নিক ও বার্ষিক গতির কারণে দিন রাত হচ্ছে, ঋতু পরিবর্তন হচ্ছে, যার কারণে পৃথিবীটা মানুষ ও জীবজন্তুর জন্যে আবাসযোগ্য হয়েছে - এত সব সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা দেখিয়েই অনেকেই দাবি করে, এর পেছনে নিশ্চিতভাবেই ঈশ্বর আছেন, নচেৎ এত এত সুষ্ঠুভাবে সব কিছু চলতে পারতো না। বাস্তবে, আমরা পৃথিবীর চারদিকে যে শৃঙ্খলাটা দেখছি, সেটা মূলত দুটো বিশৃংখলার মাঝে পাওয়া একটু ফুসরত। এই বিশ্বজগতে প্রতিনিয়ত অসংখ্য নক্ষত্র, গ্যালাক্সি একে অপরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত রয়েছে, গ্রহে আছড়ে পড়ছে কোন গ্রহাণু বা ধুমকেতু, কখনো বা বাইরে থেকে ধেয়ে আসা কোন জ্যোতিস্ক কোন নক্ষত্রের মহাকর্ষে বাঁধা পড়ে গ্রহ হয়, বা বড় কোন গ্রহের মহাকর্ষে আটকে পড়ে হয় উপগ্রহ, কখনো বা, মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়, কোন সময়ে ছোট গ্যালাক্সি বড় গ্যালাক্সির পেটের মধ্যে ঢুকে যায়! পুরা বিশ্বজগৎ জুড়েই চলছে এমন তুমুল বিশৃঙ্খলা। আমাদের সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহ - উপগ্রহের সৃষ্টি, কিংবা সৌরজগতে আটকে পড়ার মাঝেও আছে বিশৃঙ্খলা! এই মুহুর্তেও আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ে'ও ধেয়ে চলেছে পার্শবর্তী গ্যালাক্সি এণ্ড্রোমিডা, এই দুই গ্যালাক্সির মাঝে সংঘর্ষ অনিবার্য (ততদিনে অবশ্য কোটি প্রজন্ম পার হয়ে যাবে, যদি তার আগে পৃথিবী ধ্বংস না হয়ে যায়, বা পৃথিবীটা মানুষের জন্যে বাসযোগ্য থাকে)। এই বিশ্বজগৎ কতগুলো প্রাকৃতিক নিয়মের অধীনে চলছে ঠিকই, কিন্তু এখানকার সমস্ত কিছুই লাগাম ছাড়া, উদ্দেশ্যহীন, স্বতঃস্ফূর্ত। ফলে, এই বিশৃংখল মহাবিশ্বে সমস্ত ঘটনাই আকস্মিক ও অকস্মাৎ, কোন ঈশ্বরের পক্ষে যেমন প্রাকৃতিক সেই নিয়মগুলোর ব্যত্যয় ঘটানো সম্ভব নয়, তেমনি ঈশ্বরের বাবারও সাধ্য নেই যে, এই বিশ্বজগতে শৃঙ্খলা আনবে। অতএব, প্রমানিত হলো যে, ঈশ্বর বলে বাস্তবে কিছু নেই।

ঙ) "ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজমান": কোন বাস্তব কিছুর পক্ষেই আসলে সর্বত্র বিরাজমান হওয়া সম্ভবই না! সর্বত্র বিরাজমান হলে অন্য আর কিছুর অস্তিত্ব থাকা সম্ভব নয়, অথবা অন্য যা কিছু আছে, সেগুলোকেও সর্বত্র বিরাজমান সেই সত্ত্বার অংশ বলতে হয়। অর্থাৎ, ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজমান - এটা ধরে নেয়ার আরেক অর্থ হচ্ছে জগতের যা যা কিছু আছে, তার সবই ঈশ্বর। মানে, আমি আপনি থেকে শুরু করে, জীব - জড় সবকিছুই ঈশ্বর, মানুষের মল বা পশুপাখির বিষ্ঠা, থেকে শুরু করে গ্রহ - তারা - নক্ষত্র সবই আসলে ঈশ্বর। এভাবে সবকিছুকে ঈশ্বর নাম দিয়ে ডাকলে আপত্তির কিছু দেখি না, কিন্তু বুঝতে হবে - সেক্ষেত্রে ঈশ্বরকে স্রষ্টা বলার উপায় থাকবে না। কেননা, ঈশ্বর যে নতুন কোন কিছু একটা সৃষ্টি করবেন, সেটা কোথায় বা কিভাবে সৃষ্টি করবেন? সেই ফাঁকা জায়গাটিই তো নেই, যেহেতু সর্বত্রই অলরেডি তিনি রয়েছেন! থার্মোডাইনামিক্সের সূত্র অনুযায়ীও আসলে এগুলো অসম্ভব। তবে, ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজমান - এর আরো দুটো অর্থ করা যেতে পারে। স্থান বা স্পেস এর ধারণা অনুযায়ী একমাত্র এই স্পেসই সর্বত্র বিরাজমান। বিশ্বজগতের সর্বত্রই স্পেস বিদ্যমান। ফলে, ঈশ্বরকে স্পেস বলা যেতে পারে, সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে - এই স্পেস কেবলমাত্র একটা ডাইমেনশন মাত্র, তার ফিজিকাল কোন অস্তিত্ব বা সত্ত্বা নেই। মানে স্পেস কোন কিছুই করতে সক্ষম নয়, সৃষ্টিকর্ম তো দূর অন্ত! স্পেস বাদে আরেকটা জিনিস আছে, যা সর্বত্র বিরাজমান। তা হচ্ছে শূণ্য। গাণিতিকভাবে এই শূণ্যই সবকিছুর মাঝে বিদ্যমান। আপনি যেকোন কিছুর সাথে একটা শূণ্য যোগ করতে পারবেন না, তাতে সেটা সেই থেকে যাবে, কোন পরিবর্তন হবে না। ফলে, একমাত্র এই শুণ্যই সর্বত্র বিরাজমান। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, ঈশ্বরই হচ্ছে আস্ত একটা শুণ্য! অতএব, প্রমানিত হলো যে, ঈশ্বর বলে বাস্তবে কিছু নেই।

চ) "ঈশ্বর পরম দয়ালু": দয়ার ব্যাপারটা কেবলমাত্র প্রাণধারণকারী সত্ত্বা তথা জীবের জন্যে প্রযোজ্য, এবং সবুজ গাছ ব্যতীত কারোর পক্ষেই অপর জীবে দয়া দেখানো সম্ভবই নয়। এই জীবজগতটাই টিকে আছে যে খাদ্য শৃংখলের উপরে, সেখানে একমাত্র সবুজ গাছ বাদে সকলের জন্যেই একে অপরকে ভক্ষণ করাই হচ্ছে বেঁচে থাকার মূল মন্ত্র। খাদ্য শৃংখলে নীচে অবস্থান যারা করে, তারা উপরের খাদকদের নির্দয় ক্ষুন্নিবৃত্তির শিকার। এমন ব্যবস্থা যদি ঈশ্বরের হাতে তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে সেই ঈশ্বরকে আর যাই হোক, পরম দয়ালু বা নিদেন দয়ালুও বলা সাধে না! ঈশ্বর যখন এক জীবের সামনে অন্য জীবকে খাবার হিসেবে তুলে দিচ্ছেন, তখন তিনি খাদক জীবের প্রতি দয়া দেখাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু খাদ্য হওয়া জীবের প্রতি ঠিক ততখানিই নির্দয়, পাষাণ হয়ে যাচ্ছেন! জীবজগতের সবচেয়ে দয়ালু জীব সবুজ গাছপালা, যারা কখনও অন্য জীবকে হত্যা করে না, জীবন্ত খেয়ে ফেলেনা (মারা যাওয়ার পরে খায়), বরং সকল প্রাণীকূলের বেঁচে থাকার জন্যে অতীব প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ করে, সেই সবচেয়ে দয়ালু জীব গাছাপালাই সবচেয়ে বেশি নির্দয়তা - নির্মমতার শিকার! এছাড়াও, ঈশ্বর রোগ - বালাই, ঝড় - বন্যা - সুনাম - ভূমিকম্পের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রভৃতির মাধ্যমে কত শত জীবকে হত্যা করেন, জীবনে ভয়ানক দুর্ভোগ দেন - তখন তার সেই দয়া কোন শিকেয় তোলা থাকে? মানুষ ও বিভিন্ন প্রাণীর ক্ষেত্রে যে অনেক সময় দুর্বল, রোগা, পঙ্গু শিশু সন্তানের জন্ম দেন, অনেককে যে জন্মের পরপরই বা অল্প বয়সে মৃত্যু দেন, সেখানেই বা কোন দয়া কাজ করছে? অনেকেই বলতে পারে, ঈশ্বর নাকি এভাবে পরীক্ষা করছেন! মানুষকে (এবং অন্য জীবকেও কি?) এভাবে পরীক্ষা করার উদ্দেশ্য কি, এতে ঈশ্বরের কোন লাভটা হচ্ছে? তাঁর মনের আনন্দ, কিংবা খেয়াল-খুশি বা অলস সময় কাটানোর খেলা বাদে এসবের তো কার্যকারিতা নেই, স্রেফ মনের আনন্দের নিমিত্তে পরীক্ষার নামে মানুষের জীবনে এত দুর্ভোগ প্রদানের চাইতে নির্দয় ও নির্মম কাজ আর কিছু থাকতে পারে কি? অতএব, প্রমানিত হলো যে, ঈশ্বর বলে বাস্তবে কিছু নেই।

ছ) "ঈশ্বর সব শুনেন, সব দেখেন, ঈশ্বর রাগেন, খুশী হন, সাজা দেন, পুরস্কার দেন, ঈশ্বর ভালোবাসেন": শুনা, দেখা, রাগারাগি করা, খুশী হওয়া, সাজা দেওয়া, পুরস্কৃত করা, ভালোবাসা - এসব কিছুই মনুষ্য প্রজাতির কার্য, আচার আচরণ, আবেগ অনুভূতির সাথে সম্পর্কিত। সেখান থেকেই বুঝা যায়, মানুষ আসলে নিজের আদলে ঈশ্বরকে কল্পনা করে নিয়েছে। ঈশ্বর যদি শুনেন, প্রশ্ন আসবে তার কি তবে কান আছে? যদি তিনি দেখেন, কি দিয়ে দেখেন? তাঁর কি চোখ আছে? রাগ করেন, খুশী হন, তাহলে কি ঈশ্বরের একটা মন আছে, আবেগ-অনুভূতি আছে? ভালো কাজের পুরস্কার দেয়া ও মন্দ কাজের সাজা দেয়ার কাজটা মানব সমাজে নিয়ম-শৃংখলা বজায় রাখা, সমাজকে সঠিক পথে রাখা - এসবের জন্যে দরকার হতে পারে, কিন্তু মৃত্যুর পরে এরকম পুরস্কার আর সাজা দিয়ে ঈশ্বরের বা অন্যদের কি লাভ হচ্ছে? এতে দুনিয়ার মানুষের সামনে একরকম মূলা ঝুলিয়ে সুপথে রাখা আর কুপথ থেকে দূরে রাখার কাজ হতে পারে যেমন, তেমনি দুনিয়াতেই দুষ্টের দমন - শিষ্টের পালন করতে না পারার ব্যর্থতা শিকার করে নিতেও এটা আগ্রহী করতে পারে। মানে, অর্থাৎ নিপীড়িত, শোষিত, বঞ্চিত হতাশ মানুষ পরকালের ন্যায়বিচারের আশায় এভাবেই সান্ত্বনা খুঁজে নিয়ে মুখ বুজে সহ্য করে যেতে পারে। তাতে আদৌ সমাজের মঙ্গল সাধিত হয় না, পারলৌকিক সাজার ভয় আর পুরস্কারের লোভ, মানুষের উপরে ইহলোকে বিপরীত প্রভাবই রাখে, মানে ভালো কাজের জন্যে মানুষ সাজা ভোগ করতে থাকে, আর খারাপ কাজের জন্যে পুরস্কৃত হতে থাকে! সবমিলেই ঈশ্বরের ভালোবাসা দুনিয়ার অধিকাংশ মানুষ ও জীবকূল পায় না! অতএব, প্রমানিত হলো যে, ঈশ্বর বলে বাস্তবে কিছু নেই।

জ) "ঈশ্বর সর্বজান্তা এবং ত্রিকালদর্শী (অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানেন বা দেখতে পারেন)" - কোন কিছু জানা ও বুঝার বিষয়টাও আসলে মানবীয় বিষয়, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার বিষয়। ঈশ্বর যে কিছু জানবেন ও বুঝবেন - স্মৃতিতে সমস্ত কিছু জমা রাখবেন - প্রসেস করবেন, তার জন্যে তো তাঁর মগজ-বুদ্ধি থাকতে হবে, চিন্তা শক্তি থাকতে হবে। আর সবকিছু জানাও তো একটা অলীক ও অবাস্তব ব্যাপার। এই মহাবিস্তৃত মহাবিশ্বের সমস্ত কিছু একসাথে জেনেবুঝে বসে থাকা কারোর বা কোন কিছুর পক্ষেই আসলে সম্ভব নয়। আর, ত্রিকালদর্শী বলে কিছু নেই। হ্যাঁ, অতীতটা জানা সম্ভব, মানে স্মরণশক্তি খুব ভালো হলে, কিংবা খুব ভালো বই থাকলে, আধুনিক কালের ভালো কম্পিউটারে অনেক তথ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে অতীতকে জানা সম্ভব। বর্তমানকে জানার কিছু নেই, বর্তমানকে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে স্মৃতিকোটায় ধরে রাখা যেতে পারে। আর, ভবিষ্যৎ মানেই হচ্ছে - এখনো যা কিছু ঘটেনি। সেটা আগে থেকে জানার উপায় নেই। হ্যাঁ, পূর্ব ধারণা বা প্রেডিকশন করা যেতে পারে, অনেক ক্ষেত্রেই সেই প্রেডিকশন ঠিকঠাক হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে। ফলে, ঈশ্বরের সর্বজান্তা হওয়া ও ত্রিকালদর্শী হওয়ার দাবির মাঝে কোন রকম সারবস্তু নেই। অতএব, প্রমানিত হলো যে, ঈশ্বর বলে বাস্তবে কোন কিছু নেই।

ঝ) "ঈশ্বরের নির্দেশেই বিশ্বজগৎ চলছে, ঈশ্বরের নির্দেশ ছাড়া গাছের একটা পাতাও নড়তে পারে না" - কোন কিছুর নির্দেশেই বিশ্বজগৎ চলছে না, সবই চলছে আসলে নিজ নিজ প্রয়োজন মাফিক, বস্তুজগতের প্রাকৃতিক কিছু নিয়মের অনুসারে। একটা গাছের পাতা দূরের কথা, একজন চরমতম ঈশ্বর-বিশ্বাসী হিসেবে দাবি করা ব্যক্তিও আসলে ঈশ্বরের নির্দেশে চলছে না! কত ধার্মিক ব্যক্তিই ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ধর্মের কত বিধি-নিষেধ অমান্য করে, তার ইয়ত্বা নাই। ঈশ্বর বলেছেন, মিথ্যা বলো না, তবু লোকে মিথ্যা বলে; ঈশ্বর বলেছেন, সুদ-ঘুষ খেয়ো না, মানুষ সুদ-ঘুষ খায়, অপরকে ঠকিয়ো না, তবু ঠকায়। নামাজ-রোজা, পূজা - আর্চনা - এসবেও কতজন কত ফাঁকিঝুকি মারে! খোদ সবচেয়ে বড় ফেরেশতা ঈশ্বরের নির্দেশ অমান্য করে শয়তান হয়ে গেলো! ধার্মিক ব্যক্তিরই এই অবস্থা, আর আমার মত নাস্তিক হলে তো কথাই নেই! ঈশ্বরকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েই - তার নির্দেশ অমান্য করি! ঈশ্বরের নির্দেশ ব্যাপারটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে একটা কৌতুককর ব্যাপার! আর, যদি বলা হয় - ঈশ্বরের নির্দেশ অমান্য করাটাও আসলে ঈশ্বরের ইচ্ছায় বা নির্দেশেই ঘটছে; তার চাইতে হাস্যকর আর কি হতে পারে? মানে, আমি এই যে ঈশ্বরকে ভুল ও ভুয়া প্রমাণ করে এই লেখাটি লিখছি, কিংবা আরেকজন ঈশ্বরকে গালাগালিই করছে, সেসবও যদি ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই হয়ে থাকে, তাহলে ঈশ্বরের এমন ইচ্ছার মূল্যই থাকলো কি, আর এসব নিয়ে কথা বলারই কি আছে! যা কিছু ঘটে বা হয়, সব ঘটার ও হওয়ার পরেই যদি বলে দেয়া, এমন এমনটাও ঈশ্বরের ইচ্ছায় বা নির্দেশেই ঘটেছে, তাহল ঈশ্বরের এমন নির্দেশ ও ইচ্ছার চাইতে অগুরুত্বপূর্ণ ও ফালতু বিষয় জগতে আর কি থাকতে পারে? অতএব, প্রমানিত হলো যে, ঈশ্বর বলে বাস্তবে কিছু নেই।

ঞ) "ঈশ্বর সর্বশ্রেষ্ঠ ন্যায়বিচারক" - ঈশ্বরের ধারণাটিই হচ্ছে জাঁদরেল, প্রতাপশালী একনায়কতন্ত্রের ধারণা, এর সাথে ন্যায়বিচারের তো কোন সম্পর্কই থাকা সম্ভব না! ঈশ্বরকে তখনই ন্যায়বিচারক বলা সম্ভব হতো, যদি তিনি তার অপার-অসীম ও একচ্ছত্র ক্ষমতা মানুষ, জীবকূল এবং অন্যসব মহাজাগতিক সত্ত্বা, যেমন ছোটখাট দেব-দেবী, এঞ্জেল বা ফেরেশতা, জ্বিন, অসুর, দানব, - সবার মাঝে ভাগ করে দিতেন, এবং কোন কিছুকেই নিয়ন্ত্রণ না করে- সকলকেই অপার স্বাধীনতা দিতেন। কোনকালেই কোন একনায়ক, ক্ষমতা কুক্ষীগত করা কাউকে ন্যায়বিচারক বলা যায় না। আর, তিনি তার সৃষ্ট সকলের মাঝেও ন্যায় বিচার করেন কি না (যেমনঃ মহা পরাক্রমশালী - অত্যাচারী রাজাও - তার সমস্ত প্রজাকে সমান ভাবে শোষণ করেন কি না, নাকি প্রজায় প্রজায় ভেদ করেন - সেই অর্থে ন্যায় বিচার) - এই প্রশ্নের জবাবেও নবলা যাবে, তিনি মোটেও ন্যায়বিচারক নন। এই প্রকৃতি জগৎটা যদি তিনি সৃষ্টি করে থাকেন, তবে তিনি এটাকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন, সেখানে ন্যায় বিচারের কোন নামগন্ধই নেই। সারভাইবল অফ দ্য ফিটেস্ট এখানে একমাত্র মন্ত্র। সবল ও যোগ্যই এখানে দুর্বল ও অযোগ্যের উপরে ছড়ি ঘুরায়। বাঘ যখন হরিণকে খায়, বিড়াল যখন ইদুর খায়, বড় মাছ যখন ছোট মাছকে খায়, এখানে ঈশ্বর দয়া করছেন বাঘকে, বিড়ালকে, বড় মাছকে! এমন একতরফা দয়াই আসলে ন্যায় বিচারের পরিপন্থী! কেননা, বাঘের খাবার হওয়া হরিণ, বিড়ালের হাতে মারা পড়া ইঁদুর বা বড় মাছের পেটে ঢুকে যাওয়া ছোট মাছ সর্বতভাবেই ঈশ্বরের ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত! মানুষের সমাজেও যদি দেখি, ক্ষমতাবান - লোভী - বিত্তবানরাই সমস্ত ভোগ বিলাস করে, সারাজীবন অন্যায় করেও পার পেয়ে যায়, অন্যদিকে ক্ষমতাহীন - গরীব - দিনরাত পরিশ্রম করা মানুষ তিলে তিলে শোষিত, নিপীড়িত হতে হতেই শেষ হয়ে যায়! ঈশ্বর কোথায় - কিভাবে তাহলে ন্যায়বিচার করলেন? মৃত্যুর পরের জগতে ঈশ্বর ন্যায় বিচার করবেন বলে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে বলা আছে। মানে, ভালো কাজের পুরস্কার দিবেন স্বর্গে পাঠিয়ে, আর মন্দ কাজের সাজা দিবেন নরকে পাঠিয়ে। মৃত্যুর পরের জীবন, আত্মা, স্বর্গ, নরক - এসব কিছুই কাল্পনিক রূপকথা বাদে কিছু না। তারপরেও, এই পুরস্কার ও সাজার গল্পের মাঝেও আসলে কোন রকম ন্যায়বিচার নেই। সেখানে, ঈশ্বর নিজের প্রতি আনুগাত্য, চাটুকারিতা বা দিনরাত তাকে ডাকা- পূজা আর্চনা- নামাজ রোজা পড়া - প্রার্থণা করা, এসবের গুরুত্ব বেশি দিয়েছেন। পুরস্কারের ক্ষেত্রে ভালো কাজের চাইতেও চাটুকারিতার গুরুত্ব যেখানে বেশি, একইভাবে সাজার ক্ষেত্রে মন্দ কাজের চাইতেও চাটুকারিতা না করার গুরুত্ব যেখানে বেশি (বিভিন্ন ধর্মে আছে, ভিন্ন ধর্মী বা অবিশ্বাসী বা ইশ্বরকে অন্য ঈশ্বরের সাথে অংশীদার করলে জাগতিক যত ভালো কাজই করুক, স্বর্গে যেতে পারবে না), - সেখানে আর যাই থাকুক, ন্যায়বিচার থাকতে পারে না! অতএব, প্রমানিত হলো যে, ঈশ্বর বলে বাস্তবে কিছু নেই।  

৭। বিভিন্ন ধর্মের ঈশ্বর সম্পর্কিত দাবি, বিশ্বজগৎ ও মানুষের সৃষ্টির ব্যাখ্যা বা কাহিনীর ভুল দেখানোর মাধ্যমেও ঐ ধর্মের ঈশ্বরের অনস্তিত্ব প্রমাণ করা যায়। যেমনঃ


ক) প্রাচীণ মিশরীয় পুরাণ অনুযায়ী, আদিতে কোনোকিছুর অস্তিত্ব ছিল না; কেবল ছিল নু (আদিম পানি বা বিশৃঙ্খলা, যা সৃষ্টির সম্ভাব্যতাকে ধারণ করে)। ওই নু থেকে দেবতাদের সৃষ্টিকর্তা আটুম নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করেন। তার মাধ্যমে রূপায়িত হয় দিনের সম্পূর্ণতা, সূর্যের সাথে এই সম্পৃক্ততার দরুন তাকে আটুম-রা বলেও উদ্ধৃত করা হয়েছে। আটুমের নিক্ষেপ করা থুতু থেকে জন্ম নিলো পুত্র বাতাসের দেবতা ‘শু’ এবং বমি থেকে আর্দ্রতার দেবী ‘তেফনুত’। পিতার ব্যস্ততার সুযোগে তারা সেই আদিম জলে নেমে হারিয়ে যায়। সন্তানদের খোঁজে আটুম নিজের চোখ তুলে ছেড়ে দিলেন নিঃসীম শূন্যতায়, আর সেখানে স্থাপন করলেন আরো বড় নতুন একটা চোখ। প্রথম চোখটা ঠিক ধরে আনলো পুত্র-কন্যাকে, আটুম এবার প্রথম চোখটাকে স্থাপন করলেন নিজের কপালে মাঝে, যা দিয়ে তিনি দেখতে পেলেন সৃষ্টির সমস্ত কিছুর অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ। অন্যদিকে সন্তানদের ফিরে পেয়ে আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলেন আটুম। তার প্রতি ফোঁটা চোখের জল থেকে জন্ম নিল মানুষ। পাহাড় আর পাথর ছাড়া তখনো তেমন কিছুই নেই। আটুম-রা, শু আর তেফনুত মিলে মানুষের জন্য যথোপযুক্ত বাসভূমি তৈরি করেন। শু এবং তেফনুতের মিলনে জন্ম নিলো পুত্র ‘গেব’ বা ভূ-পৃষ্ঠ এবং কন্যা ‘ন্যুত’ বা আকাশ। মিশরীয় বিখ্যাত দেবতা হোরাস হচ্ছে এই আটুম-রা এর নাতির নাতি। হোরাসের বাবা ওসিরিস ও মা আইসিস, এবং চাচা সেট - এই তিনজনের প্র-পিতামত হচ্ছে আটুম-রা। অন্য একটি মিশরীয় পুরাণ অনুযায়ী, আদিতে কিছুই ছিল না; কেবল ছিল খনুম (আদি দেবতা বা ঈশ্বর)। খনুম সৃষ্টি করার জন্য মনস্থির করলেন; ফলে জন্ম নিলো দেবতারা। তাকে ভাবা হতো স্বর্গীয় কুমোর; যিনি কাদা দিয়ে শিশু তৈরি করে মায়ের গর্ভে স্থাপন করে দেন। বস্তুত খনুম সবকিছুই সৃষ্টি করেছেন কাদা থেকে। দেবতা, মানুষ, পশু-পাখি, মাছ এবং গাছকেও। তবে মানুষ সৃষ্টির ব্যাপারে ছিলেন সবচেয়ে সতর্ক। শরীরের আকৃতি ও রক্তপ্রবাহের জন্য নালী সৃষ্টির পর ঢেকে দিলেন চামড়া দিয়ে। বিভিন্ন রকম মানুষ সৃষ্টির জন্য তার কাছে রয়েছে কুমোরের চাকা। খনুম মাটি থেকে সৃষ্টি করলে সে তাকে জীবন ফুকে দিতেন। প্রাচীণকালে মিশরীয়দের এসব ধর্ম বিশ্বাস এখন আর কেউ ধারণ করে না, ফলে যে কারোর কাছে এসব কেবলই কাল্পনিক কাহিনী, মিথ বাদে কিছুই নয়। যদিও, এখনকার প্রচলিত বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসে পানি থেকে বা মাটি থেকে মানুষ (ও জীবজন্তু) তৈরি, ঈশ্বর কর্তৃক মানুষের শরীর তৈরি করে সেখানে আত্মা ফুকে দেয়া - এমন কাহিনীগুলোও ঠিকই পাওয়া যাবে। সেগুলোতে বিশ্বাস আনা মানুষই নিশ্চিন্তে বলে দিবে- অতএব, প্রমানিত হলো যে, আটুম-রা ঈশ্বর বা খনুম ঈশ্বর বলে বাস্তবে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই।

খ) ঋগ্বেদের পুরুষসূক্ত অনুযায়ী, ঈশ্বর তথা পরব্রহ্ম বা পুরুষের বিরাট নামক বিশ্বরূপ হল সৃষ্টির উৎস। পুরুষ নিজেকে আহুতি দিয়ে পক্ষী, বন্য ও গবাদি পশু, চার বেদ, মন্ত্রের ছন্দ সৃষ্টি করেন। তার মুখ, বাহু, জঙ্ঘা ও পা থেকে চার বর্ণের, মন থেকে চন্দ্র ও চোখ থেকে সূর্যের জন্ম হয়। তার মুখ ও নিঃশ্বাস থেকে ইন্দ্র ও অগ্নির জন্ম হয়। তার নাভি থেকে আকাশ, মাথা থেকে স্বর্গ, পা থেকে পৃথিবী ও কান থেকে অন্তরীক্ষের জন্ম হয়। এই সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে মানুষ, জাগতিক ও মহাজাগতিক সকল সত্ত্বার মধ্যে একত্ব স্থাপিত হয়। - বন্য ও গবাদি পশু, চন্দ্র, সূর্য, আকাশ, পৃথিবী, অন্তঃরীক্ষ, অগ্নি, মানুষ, জাগতিক সকল সত্ত্বার এরকম সৃষ্টির কাহিনীগুলো সম্পূর্ণভাবেই কাল্পনিক রূপকথা বা মিথ। বেদ আর মন্ত্রের ছন্দ বস্তুত মানুষেরই তৈরি, চার বর্ণ বা বর্ণভেদ প্রথা মানব সমাজে ক্ষমতাধর মানুষের তথা শাসক গোষ্ঠীর হাতে পুরোহিততন্ত্রের সহযোগে উদ্ভূত। আর, ইন্দ্র দেবতা, মহাজাগতিক সত্ত্বা বলেও কোন কিছু নেই। পরব্রহ্ম বা পুরুষ ঈশ্বর কর্তৃক এমনতর সৃষ্টিতত্ত্বের সাথে বাস্তবতার কোন রকম সংযোগই নেই। অতএব, প্রমানিত হলো যে, পরমব্রহ্ম, পরমেশ্বর বা পুরুষ ঈশ্বর বলে বাস্তবে কোন কিছুই নেই।

গ) জরাথুষ্ট্রীয় ধর্ম বা জরথুস্ত্রবাদ অনুযায়ী, ভালো বা শুভশক্তির ঈশ্বর হচ্ছেন আহুরা মাজদা ("সর্বজ্ঞানস্বামী") বা ওরমুজদ, আর মন্দের ঈশ্বর হচ্ছেন আংরা মাইনু বা আহরিমান। সৃষ্টির একদম আদিতে কিছুই ছিল না, কেবল ছিলো আহুরা মাজদা যিনি ছিলেন অনন্ত আলোয় আর ছিলো আহরিমান, যিনি ছিলেন নিঃসীম অন্ধকারে, এর মাঝখানে ছিল কেবলই শূণ্যতা। একদিন আহুর মাজদা সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নিলেন, প্রথমে ধাতুর তৈরি উজ্জ্বল আকাশ তৈরি করলেন, তারপরে তৈরি করলেন বিশুদ্ধ পানি, তারপরে তৈরি করলেন সমতল ও গোল পৃথিবী তৈরি করলেন, চতুর্থ ধাপে তৈরি করলেন বৃক্ষরাজি, পঞ্চম ধাপে প্রাণী এবং ষষ্ঠধাপে তৈরি করলেন প্রথম মানুষ। আহরিয়ান এসব সৃষ্টি দেখে তাদেরকে ধ্বংস করতে চাইলেন, ফলে আহুরা মাজদা তার সৃষ্টিকে রক্ষার জন্যে কিছু পবিত্র স্পিরিট তৈরি করলেন। ফলে, আহরিমানের চেস্টার পরেও কোন কিছু ধ্বংস হলো না, তবে পৃথিবীতে পাহাড়-পর্বত হলো, গাছে কাঁটা হলো, প্রাণিতে - মানুষে রোগ - শোক - দুঃখ - দুর্দশা এলো। বুঝাই যাচ্ছে, এসব কাল্পনিক সৃষ্টিকাহিনীগুলোর মাঝে সত্যতার লেশমাত্রও নেই। এই মিথগুলো থেকেই কিছুটা বিবর্তিত হয়ে পরবর্তীতে অন্যান্য ধর্মের ঈশ্বর ও শয়তান বা ডেভিলের ধারণা, ফেরেশতা বা এঞ্জেল এর ধারণা, ধাপে ধাপে সৃষ্টির ধারণাগুলো এসেছে। সেগুলোর সাথেও বাস্তবতার কোন সম্পর্ক নেই। অতএব, প্রমানিত হলো যে, ভালো ঈশ্বর (আহুরা মাজদা) কিংবা খারাপ ঈশ্বর বা শয়তান (আহরিমান) বলে বাস্তবে কোন কিছুই নেই।

ঘ) ইহুদী, খৃস্টান ও ইসলাম ধর্মের ধর্মগ্রন্থ বাইবেল ও কোরআন অনুযায়ী, জিহোভা বা গড বা আল্লাহ ছয়দিনে আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। "সৃষ্টির শুরুতেই ঈশ্বর মহাকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করলেন" (আদিপুস্তক ১-১)। আদিপুস্তক বা জেনেসিস-১ অনুযায়ী, ঈশ্বর ১ম দিনে আলো তৈরি করেন ও আলোকে অন্ধকার থেকে আলাদা করে আলোর নাম দিলেন দিন ও অন্ধকারে নাম দিলেন রাত। ২য় দিনে জলকে দুভাগ করে উপরের জল ও নীচের জলের মাঝখানের ফাঁকা জায়গার নাম দিলেন আকাশ। ৩য় দিনে আকাশের নীচের সব জল একসাথে করে তৈরি করলেন সমুদ্র, এতে যে শুষ্ক জায়গা পাওয়া গেলো তার নাম দিলেন ভূমি, সেই ভূমিতে তৈরি করলেন গাছপালা। ৪র্থ দিনে আকাশে তৈরি করলেন সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্র। ৫ম দিনে সমুদ্রে বসবাসকারী এবং উড়ন্ত প্রাণী তৈরি করলেন। আর ৬ষ্ঠ দিনে ঈশ্বর তৈরি করেন ভূমিতে বসবাসকারী প্রাণী এবং অবশেষে নিজের প্রতিমূর্তিতে মানুষ তৈরি করেন। অন্যদিকে কোরআনে অনুযায়ী, আল্লাহ আকাশ (আসমান) ও ভূপৃষ্ঠ (যমীন) ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। তারপরে তিনি আকাশে (আরশে) আসন গ্রহণ করেছেন (উঠেছেন/ সমুন্নত হয়েছেন/ সমাসীন হয়েছেন)। তারপরে তিনি রাত দ্বারা দিনকে ঢেকে দিয়েছেন, যাতে রাত ও দিন একে অপরকে দ্রুত অনুসরণ করে। আর সৃষ্টি করেছেন সূর্য, চাঁদ ও তারকারাজী (সুরা আল আরাফ : ৫৪)। আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এর অন্তর্বর্তী  সমস্ত কিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন (সুরা সাজদা : ৪)। আল্লাহ দুই দিনে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। তারপরে ৪ দিন ধরে সেখানে অটল পর্বত স্থাপন করেছেন, বরকতমণ্ডিত করেছেন এবং খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। এরপরে তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন, আকাশকে সাত স্তরে ভাগ করলেন এবং নিকটবর্তী আকাশের শোভাবর্ধনের জন্যে প্রদীপমালার (তারকারজি) ব্যবস্থা করলেন (সুরা ফুসসিলাত :  ৯-১২ )।   সহজেই বুঝা যাচ্ছে, জরথুস্ত্রবাদের সৃষ্টি কাহিনীকেই এদিক ওদিক করে প্রথমে রচিত হয়েছে বাইবেল এর সৃষ্টিকাহিনী, সেখান থেকে এসেছে কোরআনের কাহিনী, যদিও কোরআনে আল্লাগ ৬ দিনের কবে কি সৃষ্টি করেছেন, সে সম্পর্কে বিশেষভাবে বলা নাই। একটি সুরায় ২ দিনে পৃথিবী (যমিন), ৪ দিনে পর্বত ও খাদ্য আর ২ দিনে আকাশ ও তারকারাজি সৃষ্টির কথা আছে, তবে সবগুলো দিনের হিসাব ধরলে আবার ৮ দিন হয়ে যায় (অনেক তাফসিরে বলা আছে - আকাশ তৈরির এই ২ দিন আসলে পৃথিবীর সৃষ্টির প্যারালাল ছিল)। যাই হোক, বাইবেল ও কোরআনে বর্ণিত এই আলাদাভাবে আকাশ তৈরি করা, আলো ও অন্ধকারকে আলাদা করা, আগে রাত-দিন তৈরি করা ও পরে সূর্য তৈরি করা, সূর্য - নক্ষত্রের আগে পৃথিবী বা ভূমি (যমিন) তৈরি করা- এসব কিছুই বস্তুত কাল্পনিক কিচ্ছাকাহিনী, যার মাঝে সত্যতার ছিটেফোটাও নেই। একইভাবে, বাইবেল ও কোরআন অনুযায়ী জিহোভা, গড বা আল্লাহ নিজের প্রতিমূর্তিতে প্রথম মানব আদমকে তৈরি করেন মাটি দিয়ে, তারপরে সেখানে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন। আদমের বুকের পাজরের হাড় থেকে তৈরি করেন প্রথম মানবী ইভ বা হাওয়াকে। নিষিদ্ধ ফল খাওয়ায় শাস্তি স্বরূপ তাদের গড বা আল্লাহ ইডেন গার্ডেন বা বেহেশত থেকে বিতাড়িত করেন, তারা পৃথিবীতে আসেন। প্রথম মানব-মানবী আদম-হাওয়ার এমন কাহিনীও আসলে কাল্পনিক, এতে সত্যতার লেশমাত্রও নেই। অতএব, প্রমানিত হলো যে, জিহোভা, গড বা আল্লাহ বলে বাস্তবে কোন কিছুই নেই।

ঙ) বিভিন্ন ধর্মের ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী, ঈশ্বর আছেন। অর্থাৎ, বিভিন্ন ধর্মের ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হয় সেই সেই ধর্মের ধর্মগ্রন্থকে! সেই ধর্মগ্রন্থগুলোতে ঈশ্বরের অস্তিত্বের কথা জানানো হয়েছে, কখনো কখনো ঈশ্বরের অস্তিত্বের স্বপক্ষে যুক্তিও করা হয়েছে, এবং ধর্মগ্রন্থগুলো যে ঈশ্বরের প্রেরিত বা ঈশ্বর কর্তৃক লিখিত, সেই দাবিও আছে ধর্মগ্রন্থগুলোতে। অর্থাৎ, ঈশ্বর আছে তার প্রমাণ এই ধর্মগ্রন্থ, এই ধর্মগ্রন্থ যে সত্য বলছে তার যুক্তি হচ্ছে ধর্মগ্রন্থ মানুষের লেখা নয়, সেগুলো ঐশ্বরিক। এগুলো যে ঐশ্বরিক, বা মানুষের লেখা নয়- সেটার প্রমাণও আছে ধর্মগ্রন্থে। এগুলোকে বলা হয় সার্কুলার যুক্তি, ফলে এমন যুক্তির মাঝে কোন সারবেত্তা নেই। তারচেয়েও বড় কথা, যেকোন গ্রন্থ কেবল ও কেবলমাত্র মানুষই লেখতে পারে, মানুষ ভিন্ন কোন গ্রন্থ কোনকালে অন্য কেউ লিখেছে, তার কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তার উপরে, প্রতিটা ধর্মগ্রন্থ এত অসংখ্য অযৌক্তিক, ভুলে ভরা ও পরষ্পরবিরোধী কথাবার্তায় ভরপুর যে, সেখান থেকেও বুঝা যায়, এগুলো কোন নির্দিষ্ট কালের, নির্দিষ্ট জায়গার বা সমাজের মানুষেরই লেখা। যেমনঃ কোরআনে সৃষ্টিকাহিনী, বিভিন্ন রকম অলৌকিক ঘটনা, পিতা ছাড়াই ঈসা নবীর জন্ম, যাদুবিদ্যায় বিশ্বাস, জ্বিন ও ফেরেশতার গল্পকথা, ভূমিকম্পের ভুল ব্যাখ্যা, পর্বতকে পেরেক, আকাশকে খুটিবিহীন ছাদ বলা, দুনিয়া-চাঁদ-সূর্য-নক্ষত্রের নানা ভুলভাল আলাপ, উত্তরাধিকার সম্পত্তির বন্টনের হিসাবে গাণিতিক ভুল, এক মানুষের সৃষ্টি কি থেকে- সেই ব্যাপারে একেক জায়গায় একেক কথা বলা, এমন অসংখ্য ভুলভ্রান্তিতে ভরপুর কোরআন, কিংবা আরো অনেক অনেক বেশি (যত প্রাচীণ গ্রন্থ, স্বাভাবিকভাবেই ভুলের পরিমাণ তত বেশিই হবে) ভুলভালে ভরা নিউ টেস্টামেন্ট, ওল্ড টেস্টামেন্ট, কিংবা বেদ-পুরাণ, মহাভারত, রামায়ন - এসব গ্রন্থগুলোর সবকটিই প্রকৃতপক্ষে মানুষের লেখা (কেননা, মানুষ ভুল করে, বা এক যুগে মানুষ যা সঠিক হিসেবে জানে, পরবর্তীতে জ্ঞানের উৎকর্ষতায় আগের জ্ঞানকে ভুল হিসেবে বুঝতে পারে)। অতএব, প্রমানিত হলো যে, ঈশ্বর বলে বাস্তবে কিছু নেই।

 

 

১। ঈশ্বর আছে কি নেই, তা নিয়ে অনেক আগে আরেকটি লেখা লিখেছিলাম। আগ্রহী পাঠকরা পড়তে পারেনঃ ঈশ্বর ও বিজ্ঞান - "আছে" ও "নাই" প্রমাণের কথিত দ্বন্দ্ব!

২।  অভিজিৎ রায়ের "অক্কামের ক্ষুর (occam’s razor) এবং বাহুল্যময় ঈশ্বর" এবং "মহাবিশ্ব এবং ঈশ্বর -একটি দার্শনিক আলোচনা" - শীর্ষক প্রবন্ধদুটিও পাঠ করা যেতে পারে।

বৃহস্পতিবার, ৩০ মে, ২০২৪

নাস্তিকতা, নারী ও যৌনতা, বৌদ্ধধর্ম এবং সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধ

বাঙালি নাস্তিকের একটা বড় অংশেরই নাস্তিকতার ভারকেন্দ্র থাকে যৌনতা! ধর্ম প্রচারক, ধর্মীয় মহাপুরুষ, ধর্মগুরু, সাধু, সন্যাসী, নবী, রাসুল থেকে শুরু করে এ সময়ের ধর্মবাবা, পীর, মঙ্ক, পোপ, হুজুরদের যৌন জীবন নিয়ে "রসিয়ে রসিয়ে" আলাপ করার মাধ্যমে অনেকে নাস্তিকতার চর্চা চালু রাখেন। এদেশে বিভিন্ন ওয়াজ-মাহফিলে হুজুররা বিবাহ বহির্ভুত যৌনমিলন তথা ব্যভিচারের বিরুদ্ধে সবক দিতে দিতেই, ব্যভিচারে প্রলুব্ধ করতে পর্দাহীন নারীদের বিরুদ্ধে সাবধান করতে করতেই এবং ইহকালের যৌনসংযমের মাধ্যমে পরকালের অবাধ যৌন-উদ্যানে যাওয়ার পথ বাতলে দিতেই দিতেই যে রগরগে বর্ণনা দেন, তাতে অবদমিত বাঙালির শ্রবণেই যৌনসুখ লাভ হয় যেমন, নাস্তিকদেরও ক্ষেত্রেও তেমনই ঘটে সম্ভবত! ফলে, ইসলামের কামকেলি বা কৃষ্ণের লীলাখেলা বা মহাভারত - বেদ - পুরাণে যৌনতার ছড়াছড়ি সহ বিভিন্ন কথিত নবীর শত শত নারীগমন- এসবের আলাপ বাদ দিয়ে নাস্তিকতার চর্চা যেন পূর্ণতাই পায় না, সেই ধরণের লেখাগুলোই নাস্তিকদের মাঝে হিটও সবচেয়ে বেশি! ধর্ম ও ধর্মীয় গ্রন্থে বিশ্বাস স্থাপনকারী মানুষের মাঝে যৌনতা নিয়ে যেরূপ ট্যাবু বিরাজমান এবং এই বিশ্বাস ও তার মধ্যে থাকা ট্যাবু যেভাবে নারীর প্রতি অবমাননামূলক ও নিবর্তনমূলক, তাতে বিভিন্ন ধর্মে যৌনতা ও নারীকেন্দ্রিক আলোচনা ও ঘটনাগুলোকে ধরে ধরে কথা বলাটা জরুরী, সেই জরুরী কাজটি নাস্তিকরা করতেই পারেন, ধর্মীয় মহাপুরুষদের প্রতি তার অনুগতদের মাঝে যে বিপুল শ্রদ্ধা ও ভক্তি কাজ করে, তা ভাঙ্গতে সেই মহাপুরুষের ব্যক্তিজীবনের নানা সমস্যা, বৈপরীত্য এসব দেখানোতে কোন সমস্যা নাই, তার অংশ হিসেবে যৌন জীবনের আলাপও আসতেই পারে! কিন্তু আমাদের নাস্তিক বন্ধুদের বড় অংশের মাঝেই এই কাজে আগ্রহটা অনেক বেশি, সেটি করতে গিয়ে তারা অনেকক্ষেত্রেই সময় - যুগ - সমাজ এসবের সাথে সাথে যে মানুষের রীতনীতি, নৈতিকতার বোধ বা মূল্যবোধের পরিবর্তন ঘটে- সেরকম কোন বিবেচনা রাখেন না (যেমন আজকের মূল্যবোধ দিয়ে হাজার বছর আগের সমাজের বাল্যবিবাহকে বিচার করে নবীকে পেডোফাইল বলা), ক্ষেত্রবিশেষে ধর্মীয় মহাপুরুষদের যৌন জীবন বিবৃত করতে গিয়ে একরকম অবসেশনে ভুগতে থাকেন, সত্য - মিথ্যা মিশিয়ে কাল্পনিক ভাবজগৎ তুলে ধরেন!



সেরকমই কয়েকটা লেখা পড়লাম- "আধুনিক গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, আর সুপ্রতিষ্ঠিত আইনের শাসনের প্রাণকেন্দ্র" পশ্চিম ইউরোপে ২২ বছর ধরে বাস ও কাজ করার গর্বে ভীষণ গর্বিত আমাদের এক নাস্তিক বন্ধুর লেখনীতে। ২২ বছর ধরে তিনি তার স্বপ্নভূমিতে বাস ও কাজ করলেও, তিনি লেখালেখি করেন বাংলায়, যার পাঠক বাংলাদেশী। যেই বাংলাদেশকে তিনি আবার মনে করেন, গণতান্ত্রিকতাহীন, ধর্মনিরপেক্ষতা যেখানে অসম্ভব, জনগণ ও তার বুদ্ধিজীবীরা মত প্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ে অজ্ঞই শুধু নন, মত প্রকাশের স্বাধীনতার শত্রুও। তার মতে বাংলাদেশ তার স্বপ্নের ভূস্বর্গ ইউরোপ (পশ্চিম) থেকে "গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, আর মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে কয়েক শত বছর পিছিয়ে আছে", এবং "উন্নত, শিক্ষিত আর আধুনিক গণতান্ত্রিক" ভূস্বর্গে বাস করায় "বাংলাদেশের জনগণ, সমাজ বা রাজনীতি"র কাছে ওনার "চাওয়া পাওয়া"র কিছুই নেই! তো, চাওয়া পাওয়ার কিছু যদি নাই থাকবে, কেন তিনি বাংলাদেশী পাঠকদের উদ্দেশ্যে বাংলায় লেখালেখি করেন? আমার ধারণা, বাংলাদেশের ধর্মান্ধ (তার মতে "বাংলাদেশের ৯৯% মানুষই ধর্মান্ধ, ধর্মব্যবসায়ীর সংখ্যাও বিরাট"), অজ্ঞ, মূর্খ বা অজ্ঞান মানুষকে জ্ঞানদান করতে চান, পশ্চিমা আলোয় আলোকিত তথা শিক্ষিত ও আধুনিক করে তুলতে চান! তিনি জানিয়েছেন, তার "ভাবনা জায়গা"ই হচ্ছে ইউরোপ এবং তিনি "আধুনিক ইউরোপীয় সংস্কৃতি"তে উদ্বুদ্ধ হয়েই "রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় অন্ধ" মানুষকে "আঘাত" করেন, "উসকানি" দেন। ইউরোপিয়ান উপনিবেশগুলো যেভাবে গোটা দুনিয়ার "অশিক্ষিত", "মুর্খ", "অসভ্য" ও "বর্বর" জাতিগুলোকে আধুনিক - সভ্য - ভব্য করে তুলেছে, সেই সংস্কৃতিতে বলীয়ান একজন একই কাজই করতে চাইবেন, এতে অবাক হওয়ার কিছু নাই! তবে, তিনি একটা বিষয় ভুলে যাচ্ছেন - এমন সবক দিতে চাওয়াটা যেমন তার "মহান" ইউরোপীয় সংস্কৃতির মত প্রকাশের স্বাধীনতা, তেমনি সেই "সবক" নিতে অস্বীকৃতি জানানো, ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করাটাও কথিত "ধর্মান্ধ", "মুর্খ", "অজ্ঞান" বাংলাদেশীর মত প্রকাশের স্বাধীনতার মাঝেই পড়ে, এটা শুধু মত প্রকাশের স্বাধীনতাই নয়, তার চাইতে বেশি কিছু!


সেই ইউরোপীয় স্বর্গে বাস ও কাজ করা, ইউরোপীয় সংস্কৃতির প্রতি গুণমুগ্ধ মত প্রকাশের স্বাধীনতায় সোচ্চার, নাস্তিক বন্ধু এবারে ধর্মান্ধ, মুর্খ ও অজ্ঞান বাংলাদেশীকে আঘাত ও উসকানি করার লক্ষে, বেছে নিয়েছেন সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধকে। সেই পুরাতন তরিকাই গ্রহণ করলেন, মানে "নারী" দিয়ে গৌতম বুদ্ধকে ঘায়েল করার পথ নিলেন। তিনি লিখেছেন, 

"গৌতম বুদ্ধ মানুষের জীবনের ভোগ-বিলাস আর লোভ সংবরণ করার শিক্ষক ছিলেন। অথচ তিনি নিজেই একজন সুন্দরী নারীর হাতের পায়েস খাওয়ার লোভ সামলাতে পারেন নি। তিনি সামান্য পায়েসের লোভে তার মহামূল্যবান ধ্যান ভঙ্গ করেছেন"। 

আমাদের এই নাস্তিক বন্ধুর আলোচনায় "সুন্দরী" আর "লোভ" - শব্দদুটার দিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি চলে যায়! একজন নারীর বিবরণে দর্শনদারির বিচার আর একটা গল্পকে সেনশনালাইজ করতে নারীর আগে "সুন্দরী", "অপরূপা", "নজরকাড়া", "সর্বঅঙ্গে উপচে পড়া রূপের অধিকারিণী" ইত্যাদি বিশেষণ জুড়ে দেয়াটা প্রাচীণ যুগের মিথ, পুরাণ সাহিত্য থেকে শুরু করে এ যুগের মিডিয়ায় ও ব্লগ সাহিত্যেও বিশেষ করে পুরুষ লেখকদের একটা মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে (যদিও নাস্তিক বন্ধুর দাবি, যেকোন নারীর সামনে "সুন্দরী" আর "ইয়াং" লাগিয়ে দেয়া নাকি ইউরোপীয় ভদ্রতার নিদর্শন!)

 
সিদ্ধার্থ গৌতমের এই পায়েস খাওয়ার কাহিনী বা মিথটি আসলে কি? দুরকম ভাষ্য পাওয়া যায়। উরুবিল্বের নিকটে সেনানী নামের এক গ্রামের ধনী কৃষক পরিবারে সুজাতা নাম্নী এক কুমারী কন্যা স্বপ্নে দেখেন তার স্বামী ও পুত্র সন্তান লাভ হবে। কিন্তু এরপরেও তার কোনভাবেই বিয়ে হচ্ছিলো না। ফলে, তিনি নিরঞ্জনা নদীর তীরস্থ এক নির্দিষ্ট বটবৃক্ষের পাদদেশে গিয়ে বৃক্ষদেবতার কাছে স্বামী ও পুত্র সন্তান প্রার্থণা করেন, মানে পূজা দেন। এর পরে তার বিয়ে হয় এবং পুত্র সন্তানও হয়। খুশী হয়ে সেই বৃক্ষদেবতার জন্যে পায়েস রান্না করেন (অনেক ঘন দুধের), তারপরে এক বাটি পায়েস বৃক্ষদেবতার উদ্দেশ্যে যখন নিয়ে যাবেন, সেই সময়ে গৌতম বুদ্ধ সেই অঞ্চলে এসে বৃক্ষের নীচে ধ্যান করছিলেন, সুজাতা নামক সেই নারী ভাবলেন - স্বয়ং বৃক্ষদেবতাই চলে এসে ধ্যান করছেন। সেই মনে করে তাকে এই পায়েসের বাটি খেতে দেন। অন্য ভাষ্য মোতাবেক, সুজাতা ছিলেন এক ধনী কৃষকের স্ত্রী, কিন্তু তার কোন সন্তান হচ্ছিলো না। সেই সময়ে নিরঞ্জনা নদীর পাশের বটবৃক্ষের নীচে সিদ্ধার্থ গৌতম এসে ধ্যানে বসেন। দীর্ঘদিন অনাহারে, অনিদ্রায়, চুলের জটা মিলে সন্যাসীর যেই রূপ হয়েছিলো, তাতে গ্রামে ছড়ায় যে- অনেক বড় সাধু এসেছেন, সাক্ষাৎ দেবতা এসেছেন। ফলে, অনেকেই ভীড় জমায়, সুজাতা নাম্নী সেই নারীও পায়েস সাথে করে নিয়ে যান, এক পুত্র সন্তান লাভের আশায়!


এদিকে, বটবৃক্ষের নীচে কয়েক মাস ধরে ধ্যানরত সিদ্ধার্থ গৌতম নিরঞ্জন নদীতে স্নান শেষে আসার সময়ে অনাহারে-অনিদ্রায় মুর্ছা যান। যখন জ্ঞান ফেরে, তিনি উপলব্ধি করতে পারেন যে, এমন তপস্যা আসলে নিস্ফল তপস্যা। কঠোর তপস্যা করেও নয় , চরম ভোগ বিলাসে জীবন এলিয়ে দিয়েও নয় , মাঝের পথ বা মধ্যপথই হচ্ছে আসল পথ, সত্য লাভের উপায়। তখনি তিনি স্থির করলেন আর চরম কৃচ্ছ সাধন নয়, পরিমিত আহার করে তপস্যা করতে হবে। তার এমন সিদ্ধান্তে তার সাথে সাথে তপস্যায় থাকা অন্যসব সন্যাসীরা তাকে ত্যাগ করে নিজ নিজ পথে চলে যান। সেসময়ই এসে হাজির হন সুজাতা, এক বাটি পায়েস হাতে নিয়ে। সিদ্ধার্থ গৌতম সেই পায়েস গ্রহণ করেন, এবং তা ৪৯ ভাগে ভাগ করেন, প্রতিদিন এক ভাগ করে খাওয়ার জন্যে। এভাবে ৪৯ তম দিনে সেই পায়েস শেষ করার পরেই সিদ্ধার্থ গৌতম বোধি লাভ করেন, সেখান থেকে হন বুদ্ধ! ফলে, "সুন্দরী" নারী সুজাতা এখানে ঘটনাক্রমে খাদ্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন, সিদ্ধার্থ গৌতম মূলত সুন্দরী নারীতে নয়, জীবন বাঁচানোর খাদ্যই গ্রহণ করতে গিয়ে আগের সেই কঠোর তপস্যার পথ থেকে সরে এসেছিলেন! সিদ্ধার্থ গৌতম বোধিলাভ করেছিলেন বা বুদ্ধ হয়েছিলেন, তারও মাসাধিক সময় পড়ে, ফলে তিনি সত্য সন্ধানে বা নির্বাণ লাভের জন্যে তপস্যা করছিলেন, সেটা তখনও অর্জিত হয়নি! ফলে, তখনো তিনি "মানুষের জীবনের ভোগ-বিলাস আর লোভ সংবরণ করার" শিক্ষা দেওয়া শুরু করেননি, তখনও শিক্ষক হয়ে উঠেননি। ফলে, সেই তপস্যাকালীন সময়ে "লোভ" (এটা মোটেও "সুন্দরী" নারীর প্রতি লোভ নয়, লোভ কিছু থেকে থাকলে খাদ্যের প্রতি লোভ) থাকতেই পারে, তপস্যার আগে থেকেই যদি তিনি নিজে সমস্ত রকম ভোগ-বিলাসের লোভ মুক্তই যদি থাকবেন, তাহলে আর তপস্যারই বা কি দরকার! তদুপরি, সেই পায়েস পাওয়ার সাথে সাথে তিনি সব চেটে পুটে খেয়ে সাবাড় করেননি, বা তপস্যা বাদ দিয়ে - গ্রামে গিয়ে নিয়মিত আহার করেছেন - এমনও নয়। কেবল, আগের অনাহার বাদ দিয়ে কঠোর তপস্যার বদলে, পরিমিত আহারের পথ নিয়েছেন, ফলে এক বাটি পায়েস ৪৯ দিন ধরে খেয়েছেন! একে কি "লোভ" বলা যায়?


গৌতম বুদ্ধ ও তার অনুসারী ভিক্ষুরা ভিক্ষার বাটিতে ভিক্ষা সংগ্রহ করতেন, কিন্তু গৌতম বুদ্ধের শর্ত ছিল, তারা ভিক্ষা চাইতে পারবেন না, ভিক্ষার বাটিতে এসে যা উপস্থিত হবে, তাতেই তারা সন্তুষ্ট থাকবেন! সেখান থেকে গ্রহণ করবেন, যা একান্ত প্রয়োজন, তারও চাইতে কম (পরিমিত)। মানুষের বেঁচে থাকার জন্যেই ভোগের দরকার, ভোগ করতে চাওয়া মাত্রই লোভ নয়, বরং প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভোগ করতে চাওয়া, অপরকে বঞ্চিত করে ভোগ করতে চাওয়া ও ভোগবিলাসে নিমজ্জিত হতে চাওয়াকে লোভ বলে, তার সাথে কি গৌতমের সেই পরিমিত পরিমাণে পায়েস খাওয়াকে কি লোভ বলা যায়? আর, সেটাকে যদি লোভ বলতেই হয় - গৌতম বুদ্ধের শিক্ষার মাঝে এমন "লোভ" করার কথাই বলা আছে, এই বেঁচে থাকার ন্যুনতম রসদ অন্যের কাছ থেকে ভিক্ষা নেয়ার কাজ তিনি রাজ্য ত্যাগ করার থেকে পুরা জীবদ্দশায় করেছেন, তার অনুসারী ভিক্ষুরাও শত শত বছর ধরে করেছেন; সেগুলো বাদ দিয়ে সেই "সুন্দরী নারীর" পায়েস খাওয়ার লোভের গল্প আনার উদ্দেশ্য আসলে কি?
 

ফলে, আমাদের সেই নাস্তিক বন্ধুর আসল দৃষ্টি যে গৌতমের এই পায়েস খাওয়ার লোভের দিকে ছিল না, বরং ছিল "সুন্দরী নারী"র দিকে, তা তার বিভিন্ন কমেন্টের আলোচনায় এবং পরের পোস্টে পরিস্কার হয়ে যায়! কেননা সেই পোস্টের কমেন্টে তিনি লিখেছেনঃ 

"আমার কাছে মনে হয়- তিনি ছিলেন সংসারত্যাগী ভন্ড",  

তার বন্ধুর বলা "বাড়ি ফিরে নাকি স্ত্রীর কাছে ক্ষমাও চেয়েছিলেন" এর জবাবে বলেছেন, 

"পরকীয়া করে এসে বেশির ভাগ পুরুষই সাধারণত স্ত্রীর কাছে ক্ষমা চায়"!  

গৌতম বুদ্ধ নারীসঙ্গ বিবর্জিত ছিলেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, 

"সেটা দিনের বেলায়। রাতের বেলায় কে কোন সাধুর খবর রাখে?"  

অর্থাৎ, রাতের বেলায় সাধুর খবর কেউ না রাখলেও, আমাদের ইউরোপিয়ান নাস্তিক বন্ধুটি সেই খবর ঠিকই রেখেছেন। তার এই খবরের সম্পূর্ণ উৎস হচ্ছে- তার কল্পনাশক্তি! তার এহেন কল্পনাশক্তির পেছনে যে যুক্তিটা কাজ করেছে সেটি আরেকটি পোস্টে লিখেছেন, "খাদ্য পানীয়, গোসল, ঘুম, নিদ্রা, যৌনতার মতো মানুষের জীবনের জৈবিক চাহিদাগুলো পূরণ না হলে একটা মানুষ কি জঙ্গলে মাসের পর মাস বেঁচে থাকতে পারে?" অর্থাৎ একজন "সুস্থ এবং আধুনিক মানুষ হিসেবে" তিনি সন্যাসীদের অভূক্ত, অনাহারে-অনিদ্রায়-অযৌন জীবন যাপনের দাবিতে বিশ্বাস করেন না! কিন্তু, ভারতের পথে ঘাটে অসংখ্য সাধু-সন্যাসীকে যখন দেখেছেন - কথা বলেছেন (চারবার ভারতে গিয়ে), একদম শীর্ণকায়, জরাজীর্ণ চর্মসার শরীর দেখেও কি টের পান নি যে, তারা ভয়ানক অপুষ্টিতে ভুগছেন, প্রয়োজনের তুলনায় ভীষণ রকম কম আহারাদি তারা গ্রহণ করেন (কখনো কখনো কেবল পানি পান করেই কাটান), তাদের নিদ্রাযাপনের জন্যে আরামদায়ক বিছানা নেই, অনেকেই লম্বা সময় অনিদ্রায় থাকার পরে হয়তো, এক জায়গায় বসে বসেই ধ্যানের মত করে একটু খানি নিদ্রায় পতিত হন (মানে নিজে নিদ্রায় যান না, বরং শরীরই আপনা থেকে নিদ্রা গ্রহণ করে)! এবং, এরকম অনাহার - অনিদ্রায় শরীরের উপরে তবু অনেক প্রভাব পড়ে, - শরীরটা অনেক সময় ভেঙ্গে যায়, কিন্তু অযৌন জীবন যাপনে সেই ভয়ানক প্রভাবটাও পড়ে না! যৌন চাহিদা পূরণ না হলে একজন মানুষের মানসিক, কিছু কিছু ক্ষেত্রে শারীরিক সমস্যাও হতে পারে - যৌন অবদমন থেকে সামাজিক নানান সংকটেরও শুরু হয়, কিন্তু তার অভাবে কোন মানুষ মারা যায় না, পানি - খাবার - বাতাস বাদে পুরোপুরি বাদ দিলে একটা মানুষের বেঁচে থাকা সম্ভব না হলেও, সারাজীবন যৌনতা বাদ দিয়েও দিব্যি বেঁচে থাকতে পারবে! এই দুনিয়ায় অধিকাংশ মানুষকেই (বিশেষ করে নারীকে), জীবনের একটা বড় সময় যৌনক্ষম হওয়ার পরেও বা যৌন আকাঙ্ক্ষা থাকার পরেও অযৌন জীবন কাটাতে হয়! সামাজিক-ধর্মীয় নানা মূল্যবোধ - নৈতিকতার ধারণা মানুষকে যৌন সংযমে উদ্বুদ্ধ যে করতে পারে তা আমরা আমাদের চারপাশেই দেখতে পাই। ফলে, প্রচণ্ড রকম মানসিক ইচ্ছা, তপস্যা -প্রভৃতিও কাউকে যৌনতা বিমুখ জীবন যাপনে সাহায্য করতে পারে বৈকি! ফলে, এটাকে অসম্ভব বলে উড়িয়ে দিয়ে - গৌতম বুদ্ধকে পরকীয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করতে হলে- কিছু ন্যুনতম রেফারেন্স হাজির করা দরকার সবার আগে! তা নাহলে, এসব কাল্পনিক রগরগে গল্প বানানোটার মাধ্যমে নিজের চিন্তার ও মানসিকতার বৈকল্যই কেবল প্রকাশ পায়! আর, নাস্তিক বন্ধুটির "পরকীয়া" আর "স্ত্রীর কাছে এসে ক্ষমা" চাওয়ার অংশটাও সেই উত্তপ্ত (অবদমিত যৌন বাসনায়) মস্তিস্কেরই কল্পনাই বটে! সিদ্ধার্থ গৌতম তার স্ত্রী গোপা-যশোধরা বা বিম্বা বা শুভদ্রকা - কে এবং তার পুত্র রাহুলকে, পুরো রাজ্য ও সংসার ত্যাগ করেই সন্যাসব্রত নিয়েছিলেন! কখনই আর সেই সংসার জীবনে, বা পারিবারিক জীবনে ফিরেননি। স্ত্রী - পরিবার - সংসার ত্যাগ করার পরে যদি সিদ্ধার্থ কোথাও কোন নারীর সাথে মিলিতও হতেন, সেটাকে কি কোনভাবেই "পরকীয়া" বলা যেতো? কিন্তু এই নাস্তিক বন্ধুর ভাষায় এটি হচ্ছে "পরকীয়া"ই। এবং, সেই সমাজে বহুবিবাহ নৈমত্তিক ছিল, বিশেষ করে রাজার - রাজপুত্রের বহু নারীতে গমনটা খুব স্বাভাবিক বিষয় ছিল, সেই সময়ে সাবেক স্ত্রী, যার সাথে আবারও পরিবার-সংসার করার কোন আগ্রহই ছিল না, গৌতম বুদ্ধ গিয়ে ক্ষমা চাইবেন পরকীয়ার জন্যে? আমাদের নাস্তিক বন্ধু যেই গল্পটি ফেঁদেছেন, তা কি খুব বিশ্বাসযোগ্য হলো? গৌতম বুদ্ধ সাবেক স্ত্রীর কাছে আদৌ ক্ষমা চেয়েছিলেন কি না জানি না, কিন্তু এই যে স্ত্রীর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন শুনেই "পরকীয়া"র কথা মাথায় আসা, সিদ্ধার্থ গৌতম স্বামী ও পিতা হিসেবে যে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন, পরিবার-সংসার ত্যাগ করে স্ত্রীর প্রতি যে অবিচার করেছেন - তার জন্যেও তিনি তার স্ত্রীর কাছে ক্ষমা চাইতে পারেন, এমনটাও ভাবতে না পারার কারণ হচ্ছে - ঐ উত্তপ্ত মস্তিকের উত্তপ্ত (হট) কল্পনাই!


সেই নাস্তিক বন্ধু অবশ্য এর পরে, গৌতম বুদ্ধের যৌন জীবনের প্রমাণ হিসেবে কিছু ইরোটিক "বুদ্ধ" মূর্তির ছবি হাজির করে জানিয়েছেন, "এই ছবিগুলো সব বৌদ্ধমূর্তির। এশিয়া মহাদেশের চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, নেপাল সহ আরো অনেক দেশে বুদ্ধের এই ধরনের প্রেমময় সঙ্গমরত মূর্তি পাওয়া যায়। এসব মূর্তি শত বছর ধরে শিল্পীরা তৈরী করেছেন বুদ্ধের প্রেমময় সন্ন্যাস জীবনের ইতিহাস থেকে, আমার ফেসবুক স্ট্যাটাস পড়ে নয়"! মানে শত বছর ধরে শিল্পীরা এসব মূর্তি নাকি তৈরি করেছেন বুদ্ধেরই "প্রেমময় সন্যাস জীবনের ইতিহাস" থেকে! সেই প্রেমময় জীবনের ইতিহাস তিনি পেয়েছেন, এসব মূর্তি থেকে, কিন্তু গৌতম বুদ্ধের যাবতীয় আলোচনা, বক্তব্য, তার জীবনী - এসব তার কাছে গৌণ হয়ে যায়। সিদ্ধার্থ গৌতমকে নারীসঙ্গে প্রলুব্ধ করার জন্যে যে সে সময়ে নানারকম উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো, শুধু তাকে নয় - তার অনুগত শিষ্য ভিক্ষুকেও প্রলুব্ধ করতে বিভিন্ন সময়ে "সুন্দরী" ও "আকর্ষণীয়" নারীকে পাঠানো হয়েছিলো, এবং কেউই সফলকাম হয়নি - এমন কাহিনীগুলোও যে শত শত বছর পার হয়ে হাজার বছর ধরে মানুষের মাঝে মিথের মত করে আছে, সেগুলোর ঐতিহাসিক মূল্য আমাদের নাস্তিক বন্ধুটির কাছে নেই! কেননা, নারীসঙ্গ আর জৈবিক চাহিদাকে অস্বীকার করে বেঁচে থাকা অসম্ভব বলেই তার ধারণা! সে যাই হোক, এই বুদ্ধ মূর্তিগুলোর রেফারেন্স আসলে কেমন, সেই আলাপই করি।


নাস্তিক বন্ধুর ছবিদ্গুলোতে দুই রকমের ছবি আছে, চারটি হচ্ছে - নগ্ন বুদ্ধের কোলে এক নারীর জড়িয়ে রাখা আসনের মূর্তি, আর দুটি স্যাণ্ড স্টোনে খোদাই করা সঙ্গম রত নারী-পুরুষের ভাস্কর্য। মজার ব্যাপার হচ্ছে- এই দুটি ভাস্কর্যের কোনটিই আসলে বুদ্ধের কিংবা গৌতম বুদ্ধের নয়। থাইল্যাণ্ডের বুরিরাম শিব পার্কে থাকা এই ভাস্কর্যের পুরুষ চরিত্রগুলোর সবই আসলে শিবের। বুরিরাম প্রদেশে অবস্থিত এই Phanom Rung Historical Park এখন পুরাকীর্তির অন্যতম আকর্ষণ, ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজেরই অংশ। হিন্দু খমের সাম্রাজ্যের সময়ে এই হিন্দু মন্দির কল্পেক্সটা গড়ে তোলা হয়। কিন্তু, থাইল্যাণ্ড হচ্ছে একটা বৌদ্ধ দেশ, এবং এই খমের সাম্রাজ্যও একটা সময়ে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে, সেহেতু আমাদের নাস্তিক বন্ধুটি কল্পনা করে নিয়েছেন- বৌদ্ধদেশ থাইল্যান্ডের অন্য সব বিখ্যাত মন্দির ও সেখানকার মূর্তিগুলোর মত এমন ভাস্কর্যগুলোও হয়তো বুদ্ধের! অথবা, তিনি জেনে শুনেই মিথ্যাচার করেছেন, গৌতম বুদ্ধের নারীসঙ্গের প্রমাণ হাজির করার লক্ষে! 

থাইল্যাণ্ডের শিবপার্কের ভাস্কর্য - ১

থাইল্যাণ্ডের শিবপার্কের ভাস্কর্য - ২

 

সঙ্গমরত বুদ্ধ মূর্তি - ১

এবারে আসা যাক, বুদ্ধ মূর্তিগুলোর ব্যাপারে। প্রথমে বলে নেয়া যাক, গৌতম বুদ্ধের দর্শন আর বৌদ্ধ ধর্ম এক নয়, তেমনি পরবর্তী কালের প্রচলিত বিভিন্ন ধারার বৌদ্ধ ধর্মের ধর্মচিন্তা, ধর্মীয় আচার আচরণ দিয়ে গৌতম বুদ্ধকে খুঁজতে চাওয়াটাও বড় ভুল। গৌতম বুদ্ধ কখনো বৌদ্ধ ধর্মের কথা বলেননি, নিজেকে ভগবান বুদ্ধ হিসেবে দাবি করা তো দূরের কথা ঈশ্বরের অস্তিত্বের ব্যাপারেই তিনি কখনো কিছু বলেননি। ঈশ্বর আছে কি নাই- এই প্রশ্নের জবাব দেয়া তো পরের কথা- এই প্রশ্নটাকেই অগুরুত্বপূর্ণ বলেছেন, ব্রহ্মার অস্তিত্বের ব্যাপারে ভারতীয় বিভিন্ন ঋষি-মুনির উদ্দেশ্যে উপহাস করেছেন এই বলে যে, যাকে কেউ কোন কাল দেখেনি, কেবল একজন আরেকজনকে প্রজন্ম পরম্পরায় ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানিয়েছে, আর তাতেই বিশ্বাস করে গিয়েছে ("ব্রাহ্মণগণের পূর্বজ ঋষি, মন্ত্রকর্তা, প্রবক্তা…. অষ্টক,বামক, বামদেব, বিশ্বামিত্র, জমদগ্নি, অঙ্গিরা, ভরদ্বাজ, বশিষ্ঠ, কাশ্যপ, ভৃগু……. এদের মধ্যে কি কেউ ব্রহ্মাকে স্বচক্ষে দেখেছেন? ……যাঁকে দেখেননি, জানেননি তাঁরই অস্তিত্ব নিয়ে উপদেশ করেন!…….. বাশিষ্ঠ! এ যেন সেই অন্ধগণকে ক্রমপর্যায়ে পংক্তিবদ্ধ করা; প্রথমজনও দেখতে পায় না, দ্বিতীয়জনও দেখতে পায় না, তৃতীয়জনও নয়")! ভিক্ষুদের নিয়ে সংঘ করা, ভিক্ষুদের জন্যে আশ্রমের মত করে বিহার বানানো, সেখানে বোধিলাভের জন্যে তপস্যা করা, যা ক্রমে জ্ঞান সাধণার বিহারের রূপ ধারণ করেছিলো, সেটাকেই একটা সময়ে বৌদ্ধ মন্দির করে বুদ্ধ মূর্তি বানিয়ে পুজা-আর্চনার চল শুরু হয়ে যায়। এসমস্ত আচার আচরণের সাথে গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা ও দর্শন কোন সম্পর্কই আসলে নেই। বুদ্ধের এই মূর্তি বানানোর চলটাও শুরু হয় গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর শত বছর পরে! বলাই বাহুল্য সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা ও দর্শন থেকে পরবর্তীতে যে বৌদ্ধ ধর্মের উৎপত্তি হয়েছে, সেটা আসলে ভারতীয় সংস্কৃতির সনাতনীয় আচার আচরণের প্রভাবেই তৈরি হয়েছে! মানে, গৌতম বুদ্ধের দর্শনের প্রভাবের সাথে সনাতন ধর্মের পূজা আর্চনা ও বিশ্বাসগুলোর একরকম সংমিশ্রণেই গড়ে উঠেছে বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন রীতি নীতি, আচার আচরণ!


এখন, প্রশ্ন হচ্ছে - যত বুদ্ধ মূর্তি আছে, সবই কি সিদ্ধার্থ গৌতম বা গৌতম বুদ্ধের? না, বুদ্ধ মূর্তি হিসেবে পরিচিত সমস্ত মূর্তিই আসলে গৌতম বুদ্ধের নয়। যখন বলা হয় বুদ্ধ, সেটা আসলে বোধিসত্ত্ব লাভ করা মহাসিদ্ধকে বুঝানো হয়! ফলে, বুদ্ধ মূর্তির সবাই গৌতম বুদ্ধ নন, বরং অনেকক্ষেত্রেই বুদ্ধ হচ্ছেন - বোধিসত্ত্ব লাভ করা একজন মহাসিদ্ধ ব্যক্তি। যেমনঃ লাফিং বুদ্ধা বা ফ্যাট বুদ্ধার যেসব মূর্তি পাওয়া যায় (চীনে খুব জনপ্রিয়), সেগুলোর কোনটা শাক্যমুনি বুদ্ধ বা গৌতম বুদ্ধ, কিংবা The Buddha নয়, বরং "কিসি" নামের এক চাইনিজ ভিক্ষু, যার হাত ধরেই আসলে চীনে চান বৌদ্ধধর্মের (মহাযান বৌদ্ধধর্মেরই চাইনিজ ভার্সন) প্রসার ঘটে, তিনি ভিয়েতনাম, কোরিয়া, জাপানেও বৌদ্ধধর্মকে নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি "বুদাই" নামে প্রসিদ্ধিলাভ করেন! আমাদের নাস্তিক বন্ধু যে "ইরোটিক" আসনে বসা বুদ্ধের মূর্তির ছবিগুলো পোস্ট করেছেন, সেগুলোকে বলা হয় ইয়াব-ইয়াম (Yab-yum), তিব্বতীয় ভাষায় যার শাব্দিক অর্থ হচ্ছে বাবা-মা। বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের একটা শাখা হচ্ছে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম। বলাই বাহুল্য, ভারতীয় পথে ঘাটে ঘুরে বেড়ানো তন্ত্র সাধক যোগীদের সাথে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের - সম্মিলনেই এই তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের ভিত গড়ে উঠে। বৈদিক যুগ থেকে চলে আসা তন্ত্র সাধনার সাথে মিলে মিশে এই তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মে বিভিন্ন আচার-মন্ত্র যোগে সেই মহাসিদ্ধ হওয়া, নির্বাণ লাভ এগুলোর চর্চা হওয়া শুরু হয়! তান্ত্রিক সাধনার একটা গুরুত্বপূর্ণ আচার হচ্ছে যৌন আচার। ইয়াব-ইয়াম এর যে মূর্তিগুলোর ছবি আমাদের নাস্তিক বন্ধু গৌতম বুদ্ধের প্রেমময় জীবনের ইতিহাস বুঝাতে পোস্ট করেছেন, সেগুলো আসলে এরকমই তিব্বতীয় তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মেরই বুদ্ধ মূর্তি। মূর্তির পুরুষটি হচ্ছে করুণা (কম্প্যাশন) আর উপায় কৌশল (স্কিলফুল মিনস) কে ধারণ করে, আর পুরুষের কোলে থাকা নারী হচ্ছে প্রজ্ঞা (উইজডম) এর প্রতিভূ। এই দুইয়ের মিলনে হচ্ছে মহাসিদ্ধ বুদ্ধ! অর্থাৎ, ইয়াব-ইয়ামের বুদ্ধ মোটেও শাক্যমুনি বৌদ্ধ বা সিদ্ধার্থ গৌতম বা দ্য বুদ্ধ নয়, বরং মহাসিদ্ধ বা বোধিসত্ত্ব প্রাপ্ত অর্থে বুদ্ধ!



কিন্তু, আমাদের সেই নাস্তিক বন্ধুর এত কিছু জানলে চলবে কিভাবে! যেহেতু তিনি বুদ্ধের সঙ্গমরত মূর্তি পেয়েছেন, তিনি চোখ বন্ধ করেই বলে দিয়েছেন - এগুলো গৌতম বুদ্ধেরই, যা শত শত বছর ধরে নাকি শিল্পীরা বুদ্ধের প্রেমময় সন্যাস জীবনের ইতিহাস থেকে বানিয়েছেন! সেখান থেকে তিনি সিদ্ধান্তও টেনে দিয়েছেন, "বুদ্ধেরও আর দশজন মানুষের মতো সকল জৈবিক চাহিদা ছিলো, তিনিও সুস্থ ছিলেন" - অর্থাৎ সকল জৈবিক চাহিদা তথা যৌন চাহিদা বুদ্ধের ছিলো এটা প্রমাণ করার সাথে সাথে জানিয়ে দিলেন, এই যৌন চাহিদা না থাকা বা যৌন চাহিদাকে সংযত রাখা - স্বেচ্ছায় নিয়ন্ত্রণ করাটাও নাকি অসুস্থতা! এলজিবিটিকিউএএ - মুভমেন্টের দারুণ অনুসারী আমাদের নাস্তিক বন্ধুটি কর্তৃক "এ" বা আসেক্সুয়ালদের এভাবে "অসুস্থ" হিসেবে চিহ্নিত করাকেই বা কি বলা যেতে পারে?


সূত্রঃ
১। আমাদের নাস্তিক বন্ধুটির পোস্ট সমূহ, যেগুলোর জবাবে এই লেখাটি লিখেছিঃ
i) https://www.facebook.com/omarfarooq.lux/posts/pfbid028SrUZkZW13fSaCxQcnG2FYL1owTD85HdQJUHgWpLETo3kSULS97rzZpPFwxxRYGel
ii) https://www.facebook.com/omarfarooq.lux/posts/pfbid04VqmjDRNUsXnWqeQ5mABGTD5Py1Eqi8fQ8fTTdVgxV22jvzjq3N7wNcyrsr5HzDJl
iii) https://www.facebook.com/omarfarooq.lux/posts/pfbid02nbLkobjfqiDK2VPga132bBD4jphfmjtZXPSrbncsQqzGJQEyeB5YuBiJh5iuEFvil
iv) https://www.facebook.com/omarfarooq.lux/posts/pfbid0qR3nXrd6jgDFfKpC5vMSkZPgm1F3FXhxAx7kAfobV7Ep5Y2h4XPdjPgE7YhxhpDBl

২। ইয়াব-ইয়াম সম্পর্কে জানতে ব্রিটানিকার পেজে ক্লিক করতে পারেনঃ https://www.britannica.com/topic/yab-yum

৩। বুদাই সম্পর্কে জানতে উইকি পিডিয়া লিংকঃ https://en.wikipedia.org/wiki/Budai

৪। ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ পেজে Phanom Rung সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে। https://whc.unesco.org/en/tentativelists/6401/

৫। Phanom Rung Historical Park সম্পর্কে উইকিপিডিয়ায় আলোচনাঃ
https://en.wikipedia.org/wiki/Phanom_Rung_Historical_Park

৬। এখানেও কিছু ছবি আছে (https://live-less-ordinary.com/sex-park-in-buriram-thailand/), সেই আলাপে বলা হয়েছেঃ //And this somewhat unnecessary erotica comes more from the Khmer influences found here, where, more or less, they worship the penis of the God Shiva. But this is ancient Hindu culture, not local Buddhist culture, and penises are often brushed over in modern times using old-world lingo like leungs, and lingums. As people prefer not to highlight the significance of these big stone penises which are found throughout. So I guess this new park is embracing these old-world traditions, albeit in the worst place possible. And right next to the park is a replica of Phanom Rung, the ancient Khmer temple and pride of the province, which centres around a majestic stone phallus of Shiva. And now the same goes for this playground where, smack bang in the centre of the sand pit, is a towering and proud stone penis, or lingum, or leung, whichever you prefer.// ভাস্কর্য গুলো খেয়াল করলেও দেখা যাবে, নর ও নারীর সেক্স এক্টগুলোতে নরের (শিবের) লিঙ্গ অনেক বেশি হাইলাইটেড ও প্রায়োর।



সংযুক্ত ছবিঃ
১। ইয়াব-ইয়াম তথা "সঙ্গমরত বুদ্ধ"মূর্তির কিছু ছবি।

সঙ্গমরত বুদ্ধ মূর্তি - ২

সঙ্গমরত বুদ্ধ মূর্তি - ৩

সঙ্গমরত বুদ্ধ মূর্তি - ৪

সঙ্গমরত বুদ্ধ মূর্তি - ৫

সঙ্গমরত বুদ্ধ মূর্তি - ৬






 
২। লাফিং/ ফ্যাট বুদ্ধার কিছু ছবি।

লাফিং/ ফ্যাট বুদ্ধ - ১

 

লাফিং/ ফ্যাট বুদ্ধ -২

 

লাফিং/ ফ্যাট বুদ্ধ - ৩

 

লাফিং/ ফ্যাট বুদ্ধ - ৪

  
৩। Phanom Rung Historical Park এর সেই পাথরে খোদাই করা ভাস্কর্যগুলোর ছবি, যেগুলোতে মূলত শিবের সেক্স এক্ট তুলে ধরা হয়ছে, বুদ্ধের নয়।

থাইল্যাণ্ডের শিবপার্কের ভাস্কর্য - ৩


থাইল্যাণ্ডের শিবপার্কের ভাস্কর্য - ৪

থাইল্যাণ্ডের শিবপার্কের ভাস্কর্য - ৫

থাইল্যাণ্ডের শিবপার্কের ভাস্কর্য - ৬

থাইল্যাণ্ডের শিবপার্কের ভাস্কর্য - ৭

থাইল্যাণ্ডের শিবপার্কের ভাস্কর্য - ৮



বিঃদ্রঃ

১। নাস্তিক বন্ধুটি অনেকদিন আমার বন্ধুতালিকায় নেই, ফলে তার পোস্টে গিয়ে কমেন্ট করার অনুমতিও আমার নেই। দেখলাম, তিনি তার সর্বশেষ পোস্টে দাবি করেছেন, "বৌদ্ধ ধর্ম বা বুদ্ধের দর্শন নিয়ে আমার পোস্টগুলোর ভুল ধরিয়ে দিতে আমি এখন পর্যন্ত কাউকে দেখিনি"! খুব সম্ভবত আমার এই লেখাটি তার দৃষ্টিগোচর হয়নি। আমার বন্ধুতালিকার কারোর যদি ইউরোপিয়ান সেই নাস্তিক বন্ধুটির পোস্টে কমেন্ট করার অনুমতি থাকে, অনুগ্রহ করে এই লেখার লিংকটি তার পোস্টের নিচে একটু শেয়ার করবেন! ধন্যবাদ। এছাড়াও তিনি "গৌতম বুদ্ধের ২৫টা দর্শণ বা বিখ্যাত বাণী, যা এই আধুনিক সময়ে এসে কেনো ভুল, অপ্রয়োজনীয় বা অপ্রাসঙ্গিক", তা "যুক্তি দিয়ে" আলোচনা করেছেন বলে একটা পোস্ট লিখেছেন। সময় পেলে, সেটিরও একটা জবাব দেয়ার চেস্টা করবো খন!

২। তার পোস্টে বৌদ্ধা ধর্মালবম্বী অনেকেই খুব ক্ষিপ্তভঙ্গীতে গালাগালি করেছেন, কয়েকজন নাকি নাস্তিক বন্ধুটিকে হুমকি-ধামকিও দিয়েছেন (সেগুলো থেকেও বুঝা যায়, তারা বৌদ্ধধর্মের অনুসারি হলেও, গৌতম ধর্মের দর্শন বা শিক্ষার ধারেকাছেও নেই)! যদিও ইসলামিক জঙ্গীদের সাথে এনাদের আমি তুলনা করি না, তারা কেবল চরম আক্রোশেই রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন, তারপরেও নাস্তিক বন্ধুটির আসল উদ্দেশ্য সফল করায়, মানে বাংলাদেশীদের "ধর্মান্ধ" হিসেবে তার দাবিকে হাতে নাতে প্রমাণ করার সুযোগ দেয়ার, তাদের প্রতি হতাশা! যেকোন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, এমনকি তা সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধের নামে চলা ধর্ম হলেও, বুঝি মানুষকে ধর্মানুভূতিতে সামান্য আঘাতেই এমন অসহিষ্ণু করে ফেলে !