শনিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

পিনাকীর 'ওপেন রিলেশনশিপ' ও 'হিন্দু-মুসলিম বিয়ে' প্রসঙ্গে

এক
সম্প্রতি (১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯) সাংবাদিক পুলক ঘটক ফেসবুকে S/he is in an open relationship! শীর্ষক একটি পোস্ট লিখেছেন, যেখানে শুরুতে নানা উদাহরণের মাধ্যমে বিদেশী ভাষা ইংরেজি ব্যবহারে অনেক রকম ভুলভ্রান্তি হয়, সে আলাপ করেছেন। তারপরে, ফেসবুকের রিলেশনশিপ অপশন হিসেবে "ইন এন ওপেন রিলেশনশিপ" বলতে কি বুঝায় তার উপরে একটি জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করে জানিয়েছেন, অনেকেই এর প্রকৃত অর্থ না বুঝেই নিজের রিলেশনশিপ হিসেবে "ইন এন ওপেন রিলেশনশিপ" সিলেক্ট করেন। এতটুকু আলাপ পর্যন্ত ঠিক ছিল, পুরোপুরি একমত না হলেও, পড়তে খারাপ লাগেনি। কিন্তু পোস্টের একদম শেষে এসে বুঝা গেলো, এই পুরো পোস্টের উদ্দেশ্য আসলে ইংরেজি ভাষার ব্যবহারে ভুলভ্রান্তি না বা "ইন ওপেন রিলেশনশিপ" এর আসল অর্থ সম্পর্কে পাঠকদের জ্ঞানদানও নয়, বরং ইসলামপন্থী ফেসবুকার ও লেখক পিনাকী ভট্টাচার্যের বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা তুলে ধরা। তার জন্যে পিনাকীর ব্যক্তিগত দাম্পত্য সম্পর্ককের ধরণকে টেনে আনতেই আসলে এই ইংরেজি ভাষার ব্যবহার ও "ইন ওপেন রিলেশনশিপ" প্রসঙ্গের অবতারণা। তিনি পোস্টের শেষে দুই তারকা দিয়ে লিখেছেনঃ
"** পিনাকী কেবল দাম্পত্যে ওপেন নন; তত্ত্বে ও জীবন-সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি আরেক ধাপ এগিয়ে। ওপেন রিলেশনশিপের দম্পতিরা যৌনতার প্রশ্নে উদার হলেও ধর্ষকামী নয়। কিন্তু পিনাকী যে বিশ্বাস, তত্ত্ব, সমাজ বা সম্প্রদায়কে আলিঙ্গন করেন তাকেই ধর্ষণ করেন। বোকারামগুলো জানেনা যে তারা এবং তাদের বিশ্বাস ঐ কথিত অজ্ঞেয়বাদীর দ্বারা নিত্যদিন ধর্ষিত হচ্ছে"। 
পিনাকী ভট্টাচার্য কবে কোন কালে তার ফেসবুকে রিলেশনের জায়গায় "ইন ওপেন রিলেশনশিপ" দিয়েছিলেন, তা নিয়ে সেই পোস্টের কমেন্টে রীতিমত তুলকালাম লেগে যায়! নাস্তিক ব্লগার, ফেসবুকার, লেখক আসিফ মহিউদ্দিন কমেন্টে পিনাকী ভট্টাচার্যের হিন্দু-মুসলিম বিয়ে প্রসঙ্গে টেনে নিয়ে এসেছেন। একবার লিখেছেন, "উনারা কীভাবে বিয়ে করবেন, কোন পদ্ধতিতে সহিহ উপায়ে কীভাবে কী করবেন সম্পূর্ণ উনাদের বিষয়", তারপরেই একটা "কিন্তু" লাগিয়ে আবার জানিয়েছেন,
"ইসলাম ও শরীয়ত প্রেমিক মুশরিক পিনাকী কীভাবে একজন মুসলিম মুমিনা নারীর স্বামী হয়, আমার কাছে তা এক বিস্ময়। আমার কোরান হাদিসের জ্ঞান যথেষ্ট ভাল। সেই সূত্রে আমি জানি, এটি ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক সম্পূর্ণ জেনা এবং ইসলাম অনুসারে তাদের সন্তানের সামাজিক স্ট্যাটাস কী সেটি যেকোন আলেমকে জিজ্ঞেস করতে পারেন"।   
কোরান হাদীস সম্পর্কে আসিফ মহিউদ্দিন যে অনেক ভালো জানেন, তার প্রমাণে তিনি সুরা বাকারার ২২১ নম্বর আয়াতও উল্লেখ করেছেন,
"আর তোমরা মুশরিক নারীদেরকে বিয়ে করোনা, যতক্ষণ না তারা ঈমান গ্রহণ করে। অবশ্য মুসলমান ক্রীতদাসী মুশরিক নারী অপেক্ষা উত্তম, যদিও তাদেরকে তোমাদের কাছে ভালো লাগে। এবং তোমরা (নারীরা) কোন মুশরিকের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ো না, যে পর্যন্ত সে ঈমান না আনে। একজন মুসলমান ক্রীতদাসও একজন মুশরিকের তুলনায় অনেক ভাল, যদিও তোমরা তাদের দেখে মোহিত হও। তারা দোযখের দিকে আহ্বান করে, আর আল্লাহ নিজের হুকুমের মাধ্যমে আহ্বান করেন জান্নাত ও ক্ষমার দিকে। আর তিনি মানুষকে নিজের নির্দেশ বাতলে দেন যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে"।
নিজেকে "ধর্মনিরপেক্ষতার সমর্থক" হিসেবে দাবি করে আসিফ মহিউদ্দিন তারপরে "মুশরেক" পিনাকী ভট্টাচার্য ও তার "মুসলিম" স্ত্রীকে কি করতে হবে বা হতো, সে পথ বাতলে দিয়ে বলেছেন,
"আমি চাই পিনাকীর স্ত্রীর ধর্মত্যাগ করে স্পেশাল ম্যারেজ এক্টে মুশরিক পিনাকীকে বিয়ে করার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক"!
পিনাকীর স্ত্রী ধর্মত্যাগ করবেন কি না, তারা কিভাবে বিয়ে করবেন না করবেন, এ সবই আসিফ মহিউদ্দিনের এখতিয়ার বহির্ভূত, ফলে তার এমন "চাওয়া" খুব অবাকই করেছে, আর একদম হতবাক হয়ে গিয়েছি, ঠিক তার পরের আলাপে,
"ইসলামী শরীয়ত অনুসারে এতে তার স্ত্রী মুরতাদ ঘোষিত হবে, এবং নারী মুরতাদদের জন্য ইসলামে শাস্তির বিধানও আছে। আর মুসলিম নারীর সাথে জেনার অপরাধে পিনাকীরও মৃত্যুদণ্ড হবে, ইসলামী শরীয়ত অনুসারে"
যদিও তিনি জানিয়েছেন, "আমি এইসব আইনের বিরুদ্ধে", কিন্তু ঠিকই ইসলামী শরীয়তের এমন আইন বের করে ফেলেছেন, যে আইন খোদ কোন মুসলিম দেশে প্রচলিত আছে বলে আমার জানা নেই! ইসলামের জেনার যে বিধান, তা মুসলমানের জন্যে প্রযোজ্য হলেও বিধর্মী বা মুশরিকের জন্যে প্রযোজ্য হবে, তেমন কোন আয়াত বা হাদিস কি আছে? কোন হাদিসে কি আমরা দেখেছি যে মক্কার পৌত্তলিক কিংবা মদীনার ইহুদীদের মধ্যে কাউকে কখনো ব্যভিচার বা জেনার দায়ে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করা হয়েছিলো? আবার, সুরা বাকারার উল্লিখিত আয়াতটিতে মুসলমান পুরুষ বা নারীকে মুশরিককে বিয়ে করতে অনুৎসাহিত করা হয়েছে, কিন্তু বিয়ে করলে সেই বিয়েকে জেনা হিসেবে বিবেচিত করে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে এমন কোন কিছু কি বলা হয়েছে? 
 
একই রকম আলোচনা অবশ্য আরো আগে পুলক ঘটক তাঁর আরেক পোস্টে করেছিলেন, সেখানে পিনাকীর স্ত্রী মুসলমান হয়ে কিভাবে হিন্দু পিনাকীকে বিয়ে করলেন, সেটি তার জন্যে জায়েজ, নাকি হারাম - এমন সব চিন্তায় ব্যতিব্যস্ত হয়েছিলেন। সেখানে তিনি লিখেছেন,
"আপনারা বলুন দেখি, হিন্দু পুরুষকে বিবাহ করা মুসলমান মেয়েদের জন্য কি জায়েজ? আমার জানামতে যারা কেতাবী নয়, তাদেরকে বিবাহ করা ইসলামে হারাম। পিনাকী একজন মুসলমান নারীকে বিয়ে করেছেন। নিজে ইসলাম গ্রহণ না করে এই কাজটি তিনি কিভাবে করেন? তার মানে কি? তিনি কি ইসলাম গ্রহণ করেছেন? যদি তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে থাকেন, তাহলে তিনি তা গোপন রাখছেন কেন? পৃথিবীতে ধর্মান্তরিত লোকের তো অভাব নেই। তাতে আইনেও কোনো বাধা নেই" 
অবাক হয়ে দেখলাম, পিনাকী ভট্টাচার্যের চিন্তার বিরুদ্ধে যাদের দাঁড়ানোর কথা, তারা পিনাকীর চিন্তাকে পরাস্ত করা নয়, অবলীলায় তার ব্যক্তিজীবন নিয়ে পরচর্চা করে বেড়াচ্ছেন! ওপেন রিলেশনশিপ, হিন্দু-মুসলিম বিয়ে- এসব নিয়ে তো আপত্তি এতদিন জানতাম কাঠমোল্লাদের, হেফাজতিদের! অথচ হেফাজতিদের পরম বন্ধু, নাস্তিক ব্লগার খুনের এপোলজিস্ট, জঙ্গীবিস্তার ও নারীবিদ্বেষ বিস্তারে ভূমিকা রাখা ওয়াজ-মাহফিল-কাঠমোল্লাদের পক্ষাবলম্বনকারী পিনাকী ভট্টাচার্যের "ওপেন রিলেশনশিপ", "হিন্দু-মুসলিম বিয়ে" প্রভৃতি নিয়ে সমালোচনায়, মজায়, গালাগালিতে মেতেছেন- প্রগতিশীল, মুক্তচিন্তক খ্যাত ফেসবুকার- ব্লগাররা! সত্যি হতাশাজনক!
 
দুই
পুলক ঘটকের আলোচ্য পোস্টের নীচে অনেক আলাপ-আলোচনা-সমালোচনাও হয়েছে, অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়েছে, এবং প্রচুর গালাগালিও হয়েছে। সেখানে এই যে অপরের ব্যক্তিজীবন নিয়ে পরচর্চা, হাসি তামাশা, ঘাটাঘাটি করার প্রতিবাদও কেউ কেউ করেছেন, তার বিপরীতে আবার অনেকে বিভিন্ন যুক্তিও করেছেন! পুলক ঘটক নিজেই প্রশ্ন রেখেছেন,
“ব্যক্তিজীবন নিয়ে কেন সমালোচনা করা যাবে না?” 
কারো ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক, পরিবার নিয়ে পরচর্চা তথা অপরের ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা আর কারোর ব্যক্তিজীবনের কোন অপরাধ-অন্যায় নিয়ে "সমালোচনা" বা অভাব-অভিযোগ তো এক নয়। আমি মনে করি, সমালোচনা থাকলে যে কারোর ব্যক্তিজীবন, বাহির জীবন- সবকিছু নিয়েই সমালোচনা অবশ্যই করা যাবে; কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, পিনাকীর সমালোচনার জায়গাটি এক্ষেত্রে কি- সেটিই আসলে আমি বুঝতে পারিনি। পিনাকী কি তার স্ত্রীকে প্রহার করেছেন? গালি দিয়েছেন? মেরিটাল রেপ করেছেন? প্রতারণা করেছেন? বা অন্য কোন রকম অপরাধ সংঘটন করেছেন? সেসব কিছু যদি না করে থাকেন, তাহলে কি নিয়ে এই "সমালোচনা" হচ্ছে? একজন ব্যক্তি ও তার স্ত্রীর ধর্মীয় বিশ্বাস কি, পৈত্রিক ধর্ম কেউ ত্যাগ করেছেন কি না, ধর্মান্তরিত হয়েছেন বা হবেন কি না, তারা কিভাবে বিয়ে করেছেন, কেমন ধরণের রিলেশনশিপে আছেন তারা তথা তাদের রিলেশনশপ "ওপেন" না কি "ক্লোজ"- এসব কিছুই সেই ব্যক্তি ও তার স্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত ডোমেইনের বিষয়। সেগুলোতে ঐ দু'জন ব্যতীত দুনিয়ার আর কারোরই নাক গলানোর কিছু নেই, এখতিয়ারই আসলে নেই! মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত ডোমেইনে অন্য কারোর অযাচিত নাক গলানোকে মোটেও "সমালোচনা" বলো যায় না, সেগুলো হচ্ছে অন্যের বেডরুমে উকিঝুকি মারা এবং অপরের ব্যক্তিগত সম্পর্ক (বা যৌনতা নিয়ে) আসর জমিয়ে গসিপিং করা! নিঃসন্দেহে এসবই খুব অরুচিকর, কুৎসিত, নোংরা ধরণের কর্মকাণ্ড! 
 
সেই পোস্টের কমেন্ট সেকশনে আরেক ধরণের যুক্তি দেখেছি,
"পিনাকী নিজেই যদি ফেসবুকে নিজের রিলেশনশিপ ওপেন দেখায়, তাহলে সেটা পুলক ঘটক ও অন্যরা কেন বলতে বা লিখতে পারবেন না?
এটিও যুক্তি হিসেবে খুব খেলো ও নীচুস্তরের যুক্তি। একজন সমকামী জুটি নিজেকে যতই সমকামী হিসেবে পরিচয় দেক, তাতে তাদেরকে সমকামী বা গে / লেজবিয়ান বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বা হাসাহাসি করার, কিংবা গালাগালি, নিন্দা-মন্দ করার অধিকার কারোর জন্মায় না! কোন নারী যদি তার ছবি আপলোড করে সবার সাথে শেয়ার করে, তার মানে এই নয় যে - তার ব্যক্তিগত ডোমেইন ভেঙ্গে গিয়ে সব পাবলিক হয়ে গেলো, এবং সকলের সেই ছবির নারীর পোশাক নিয়ে ইচ্ছেমত সমালোচনা বা গালমন্দ করার অধিকার জন্মে গেলো! বস্তুত ব্যক্তিগত ডোমেইনটা হচ্ছে, ব্যক্তির নিজস্ব বিশ্বাস ধারণ, পছন্দ মাফিক পোশাক পরিধান, বিভিন্ন জনের সাথে বিভিন্ন রকম সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া, পরিবার-সংসার গঠন, রুচি ও খাদ্যাভ্যাস, নিজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ- প্রভৃতির স্বাধীনতা। সেগুলো যদি অপরের সামনে উপস্থিতও হয়, সেই স্বাধীনতাটা তারই থাকে, "পাবলিক" তা নিয়ে "গসিপ" করার, সমালোচনা - গালমন্দ করার অধিকার পেয়ে যায় না! এমনকি, ব্যক্তিগত ডোমেইনে যখন সমস্যা ঘটে, অপরাধ সংঘটিত হয়, তখন যদি ভিক্টিম সেটিকে পাবলিক করে, তখনো তার ব্যক্তিগত ডোমেইন পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ে না। যেমনঃ কোন নারী তার ছেলে বন্ধুর সাথে বাসে এক বিভাগীয় শহর থেকে রাজধানীতে ফেরার পথে ঘুমের মধ্যে বন্ধুর হাতে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে যখন অপরাধটিকে পাবলিক করেন, তখনো অন্যের এই প্রশ্ন করার এখতিয়ার থাকে না যে, কেন সেই নারী ছেলেটির সাথে বেড়াতে গেলো, কেন রাতে একা একা একটা ছেলের সাথে বাসে ভ্রমণ করতে গেলো! নারীটি নিজে সেই অপরাধের বিবরণে তার বন্ধুর সাথে ঘুরতে যাওয়া ও বাসে ফেরার ঘটনা পাবলিকলি শেয়ার করার পরেও, সেই নারী কার সাথে কোথায় বেড়াতে যাবেন বা কোথায় কিভাবে ভ্রমণ করবেন - সবকিছুকে তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখতে হবে, তার জন্যে তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করা (ভিক্টিম ব্লেমিং), দোষারোপ করা, কৈফিয়ৎ চাওয়ার এখতিয়ার কারোর থাকতে পারে না। শ বা হাজার মানুষ নিমন্ত্রণ করে, ঘটা করে সবাইকে জানিয়ে বিয়ে করা হলেই, বর ও কনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, বোঝাপড়া, ভাব-ভালোবাসা, যৌনতা, সন্তান উৎপাদন - কোন কিছু নিয়েই অন্য কারোর নাক গলানো, মন্তব্য করা, এমনকি আড়ালে আবডালে গসিপ করার অধিকার জন্মে যায় কি? আমাদের সংস্কৃতিতে অবশ্য স্বামীর বাড়ির লোকজন, তথা শাশুড়ি, ননদ থেকে শুরু করে আত্মীয় স্বজন, এমনকি পাড়া প্রতিবেশী পর্যন্ত এই অযাচিত নাক গলায়, সেই সংস্কৃতিরই কি বহিঃপ্রকাশ ঘটছে পিনাকী ভট্টাচার্যকে নিয়ে এসব গসিপিং "সমালোচনা"র ক্ষেত্রে?
 
তৃতীয় আরেক যুক্তি দেখেছি, আমার কাছে মনে হয়েছে - সচেতনভাবে এই যুক্তির জায়গা থেকেই প্রগতিশীল, সেক্যুলার বলে পরিচিতজনেরা এমন সোচ্চার হয়েছেন। যুক্তিটি এমন,
"পিনাকী যে হেফাজতি রাজনীতি করেন, সেটায় এরকম ওপেন রিলেশনশিপ চালানোর বৈধতা কি আছে? যদি না থাকে, তাহলে পিনাকী সেই বিশ্বাসের সাথে কি বিশ্বাসঘাতকতা করছেন না?"  
"পিনাকী যে ইসলামী রাজনীতিকে ধারণ ও প্রচার করেন, সেই ইসলাম মোতাবেক তো তাদের হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কই টিকে না! তাহলে তিনি যা প্রচার করছেন, অসংখ্য অনুসারীকে যে পথ দেখাচ্ছেন, নিজেই সেটা পালন করছেন না! এহেন অসততা সবার সামনে উন্মোচন করার জন্যেও তো ব্যক্তিজীবনকে সামনে নিয়ে আসা দরকার"! 
এই ধরণের যুক্তিগুলো শুনলে একটু ধন্দে পড়ে যেতে হয়! ঠিক বুঝে উঠেতে পারি না, এমনতরো যুক্তির উদ্দেশ্য কি? কি চাচ্ছেন তারা? তারা কি ওপেন রিলেশনশিপ কিংবা হিন্দু-মুসলিম বিয়ের দায়ে পিনাকী ও তার স্ত্রীর শরীয়া মাফিক সাজা চাচ্ছেন (মুখে বলছেন, মোটেও তা চান না, কিন্তু পিনাকী ও তার স্ত্রী জেনা করেছে, শরীয়া অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মত অপরাধ করেছে বলে শোরগোল ঠিকই তুলছেন)? নাকি, পিনাকী একজন হেফাজতি-জামাতি রাজনীতির সমর্থক হয়েও কিভাবে ওপেন রিলেশনশিপে থাকতে পারে বা ধর্ম না পাল্টিয়েই হিন্দু-মুসলিম বিয়ের মত "প্রগতিশীল" অবস্থান নিতে পারছেন, সেটাই তাদের অভিযোগ তথা বিদ্বেষ? নাকি, বাংলাভাষী অসংখ্য মুসলিম হেফাজতি সমর্থক তথা পিনাকী ভক্তদের সামনে পিনাকীর প্রকৃত মুখোশ উন্মোচন করার মাধ্যমে পিনাকীকে কোনঠাসা করতে চাইছেন? এই প্রকারে এই কাজে কতখানি সফলকাম হওয়া সম্ভব (কেননা পিনাকীর হিন্দু পরিচয় জানার পরেও পিনাকীর এত মুসলিম ভক্তকূল হওয়ার পেছনে ব্যক্তি পিনাকীর ধর্ম বিশ্বাস বা তার বিয়ের ধরণ-ধারণের চাইতেও পিনাকীর চিন্তাধারা, বক্তব্য, পক্ষাবলম্বনের ভূমিকা প্রধান)? এর চাইতেও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন মনে হয়েছে, কি প্রকারে আজকের প্রগতিশীলরা পিনাকীর মুখোশ খুলে দিতে আগ্রহী? সেই হেফাজতি-কাঠমোল্লা মুসলিমদের মধ্যে যে মধ্যযুগীয় কুপমণ্ডুক ধ্যানধারণা আছে, সেটাকেই কি তারা উসকে দিতে চাচ্ছেন? এক পিনাকীকে ঠেকাতে গিয়ে তাহলে তাঁরা কোন পরিস্থিতি তৈরি করছেন?
 
তিন
পিনাকীর সেই পোস্ট ও বিশেষ করে পোস্টের নীচের কমেন্টে নানান তর্ক-বিতর্ককে কেন্দ্র করে আমিও একটি ফেসবুক পোস্ট লিখেছিলাম। সেই পোস্টের কমেন্ট সেকশনে অনেকেই পিনাকীর ব্যক্তিজীবন নিয়ে এত সমালোচনার মূল জায়গা বা মূল উদ্দেশ্যটি ব্যাখ্যা করেছেন। যেমনঃ
"এইখানে তাদের আপত্তির জায়গাটা ছিল পিনাকি যে আদর্শের প্রচার করে বা স্পন্সর করে সেই আদর্শের সাথে তার ব্যাক্তিগত জীবন সাংঘর্ষিক। এইটাও মূল আপত্তি ছিল না। মূল আপত্তি ছিল সে যা বলে, লিখে সেইটার সাথে সে সৎ না। এখন আমি যদি বলি পিনাকি তার আদর্শিক চিন্তার বাস্তবিক প্রয়োগের জায়গায় সৎ না, তাইলে কি সেইটা ব্যাক্তিগত আক্রমন হয়ে যাবে?" 
"পিনাকির বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা প্রমাণ হলে তার আইডিওলজির অসারতা বোঝা যায়। পিনাকি যা বলেন বা সমর্থন করেন সেটা তিনি ব্যক্তিজীবনে নিজেই পালন করেন না, অথবা যেই মতবাদের (সেকুলারিজম) তিনি নোংরাভাবে সমালোচনা করেন সেটার সুফল ব্যক্তিজীবনে পুরোপুরি ভোগ করেন, এটা বোঝা গেলে তার অন্ধ মুরিদদের মনেও তার বুদ্ধিবৃত্তিক হিপোক্রেসী পরিষ্কার হতে বাধ্য। নিদেনপক্ষে এটা তারা বুঝবে যে, পিনাকিকে আর যাই হোক, হেফাজতি কায়দার ইসলামের সমর্থক বলা যায় না। এবং পিনাকি নিজেও আগে পরে হেফাজত তোষণ থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হবেন। অর্থাৎ পিনাকি যে আসলেই জনপ্রিয়তা লাভের জন্য হেফাজতের মুখোশ পড়ে আছেন, সেটা উন্মোচন করা"। 
"পিনাকির বর্তমান ইসলামী রাজনীতির সাথে তার ব্যাক্তিজীবনের অবস্থান বিপরীত মুখী। তার সেই ভণ্ডামির বিরুদ্ধে লেখাটি দরকার ছিলো"।

"মূল কথাটা আপনি এড়িয়ে গেছেন বলে মনে হচ্ছে। কথা হচ্ছিলো কেউ যদি দু-মুখো আইডিওলজি একইসঙ্গে ধারণ করেন সেটা জনগণ কিংবা তার নিজস্ব পরিসরের মানুষদের জীবনে বিরূপ প্রভাব নিশ্চয়ই ফেলে। পিনাকী একদিকে হেফাজতি আদর্শ প্রচার করেন অন্যদিকে ব্যক্তিজীবনে করছেন উল্টাটা। এমন হিপক্রেসি কেউ যদি করেন তার সমালোচনা হতে পারে কিনা, সেটাই ছিল মূল আলোচনা"।
পিনাকির প্রচার করা আদর্শ বা ইসলামি/ হেফাজতি রাজনীতির সাথে ব্যক্তিগত জীবনের সংঘর্ষ দেখিয়ে অসততা বা ভণ্ডামি যেভাবে তারা খুঁজে পাচ্ছেন, দুঃখের সাথে জানাতে হচ্ছে যে, সেসবে আমি কোন ভণ্ডামি খুঁজে পাচ্ছি না! কেমন করে বা কিভাবে এগুলোকে অসততা ও ভণ্ডামি বলা যেতে পারে, তা আমার বোধগম্য নয়! পিনাকী নিজে ব্যক্তিজীবনে জন্মসূত্রে একজন হিন্দু, ঈশ্বর বিশ্বাসের দিক দিয়া অজ্ঞেয়বাদীও হলেও হতে পারেন, তবে হিন্দু পরিচয় পুরোপুরি তিনি ফেলে দেননি! এখন তিনি হেফাজতি রাজনীতির সমর্থক ও প্রচারক বলে, তাকে ব্যক্তিজীবনে ইসলামী ধর্ম-কর্মও মানতে হবে, না হলে ভণ্ড - এমন কি? ইসলামবাদী রাজনীতির সমর্থক, মোল্লা - হুজুর, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের অধিকার নিয়ে কথা বলে জন্যে পিনাকীকে ব্যক্তিজীবনে ইসলামের শরীয়া মোতাবেক চলতে হবে? এমনটাই কি এনাদের দাবি? মানে, তাকে অসততা দূরীকরণে, বা সৎ হওয়ার জন্যে সাচ্চা মুসলমান হতে হবে, হিন্দু-মুসলিম বিয়ে করা যাবে না বা ওপেন রিলেশনশিপে থাকা যাবে না? আশ্চর্য দাবিই বলতে হবে বৈকি! আচ্ছা, হিন্দু - মুসলিম আন্তঃবিবাহের বিরুদ্ধে কোন কালে পিনাকী একটা কথাও কি বলেছেন? অন্য ধর্মের, যেমন হিন্দু, খৃস্টান, ইহুদি যারা তাদের ব্যক্তিজীবনে কিভাবে কেমন করে ধর্মপালন করবে বা করবে না, ধর্মান্তরিত করতে বাধ্য থাকবে কি না, সেসব নিয়ে তিনি কোনকালে কিছু বলেছেন? তাহলে, কেমন করে তার ব্যক্তিজীবন সাংঘর্ষিক হলো? ভাইরে, পিনাকী ও ফরহাদ মাজহারদের মত বিষাক্ত সাপদের এভাবে মোকাবেলা করা যাবে? যেভাবে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে তারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন, উশকে দেন, যেভাবে হিন্দুদের উপরে, সংখ্যালঘু- আদিবাসীদের উপরে আক্রমণের পেছনে ইসলামবাদী ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার অবদানকে আড়াল করে আওয়ামী রাজনীতির ঘাড়ে পুরো দোষ দেন, আমাদের দেশে হিন্দুদের উপরে ইসলামবাদীদের হামলার দায় ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদের ঘাড়ে চাপান, নাস্তিক ব্লগারদের উপরে আক্রমণকে বৈধতা দেন নাস্তিকদের উপরে দায় চাপিয়ে, মাদ্রাসা শিক্ষা, ওয়াজ মাহফিলের বাতাবরণে সাম্প্রদায়িকতার বিস্তারকে অস্বীকার করে, দায় এড়িয়ে, অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্তের ঘাড়েই দায় চাপিয়ে এবং ইসলাম ও মুসলমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে চিত্রিত করে যান- সেসবের ভণ্ডামি ও অসততা ধরিয়ে দেয়া অধিক জরুরী। সেই রাজনৈতিক আলাপ, সমালোচনা ও বিতর্ক বাদ দিয়ে, পিনাকীর বা ফরহাদ মাজহারের ব্যক্তিজীবনের সাথে আদর্শিক জীবনের সংঘর্ষ দেখানোর মাধ্যমে আদতে তাদের এই রাজনীতিকে মোকাবেলা করা আদৌ সম্ভব? 
 
আর, সবার আগে বুঝা দরকার, কথা ও কাজের মধ্যে, কিংবা বাইরের জীবন ও ব্যক্তিজীবনের মধ্যে দ্বিমুখিতা, দ্বিচারিতা, ভণ্ডামি ও অসততা দেখানোর জন্যে, ব্যক্তিগত জীবনে বা কাজেকর্মে নেতিবাচক, অন্যায়মূলক বা সমালোচনাযোগ্য উপাদান আগে থাকতে হয়! যেমনঃ কোন বামপন্থী নেতা রাস্তায় বিশাল শ্রমিক দরদী, শ্রমিক শোষণের বিরুদ্ধে লম্বা লম্বা বক্তৃতা দিয়ে বেড়ায়, কিন্তু দেখা গেলো - ব্যক্তিগত জীবনে বিনা পারিশ্রমিকে কাজের মেয়ে রেখেছে, তাকে ভোর থেকে রাত অবধি খাটায়, নিজেরা ভালো খেয়ে অবশিষ্টাংশ খেতে দেয়, তার নিজস্ব শোয়ার ঘর বা বিছানা নেই, রাতে রান্নাঘরেই বিছানা পেতে ঘুমাতে দেয়। কিংবা দেখা গেলো, সেই বামপন্থী নেতার একটা শিল্পকারখানা আছে, সেখানে সে কম মজুরি দেয়, শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করতে দেয় না। সেক্ষেত্রে, তাকে অসৎ ও ভণ্ড রাজনীতিক বলা যাবে, কিন্তু উল্টাটা হলে? একজন পুঁজিপতি নেতা, রাজনৈতিকভাবে শ্রমিকদের দাবিদাওয়া, আন্দোলন, রাস্তায় ভাংচুর- এসবের খুব বিরোধী। কিন্তু তার যে কারখানা আছে, সেখানে সে শ্রমিকদের জন্যে খুব উচ্চ কর্মপরিবেশ রেখেছে, শ্রমিকদের ভালো বেতন দেয়, প্রতিবছর মুনাফার একটা পার্সেন্টেজ শ্রমিকদের বোনাস হিসেবে দেয়, শ্রমিকদের যেকোন অভাব অভিযোগ মন দিয়ে শুনে, দ্রুত সমাধান করে। এমন একজনকে মালিককে সামনে রেখে (মানে মালিকদের সংগঠনের নেতৃত্বে নিয়ে) অন্য মালিকরা আসলে নিজেদের শ্রমিক ঠকানোকে আড়াল করে। এখন, এই মালিকের ব্যাপারে আমাদের অভিযোগ কি হবে? কেন নিজ কারখানায় শ্রমিকদের ভালো কর্ম পরিবেশ দেয়, কেন প্রোফিট বোনাস দেয় বা কেন অন্য মালিকদের মত শ্রম বেতন-ভাতা বকেয়া রাখে না? সেগুলো দেখিয়ে তার কি অসততা, ভণ্ডামি কোনদিনও প্রমাণ করা যাবে আদৌ?
 
একইভাবে, পিনাকী ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত না হয়ে যদি অপরাধ না করে থাকে, হিন্দু হয়ে মুসলিমকে বিয়ে করে যদি কোন অপরাধ না করে থাকে,  কিংবা ওপেন রিলেশনশিপে থাকার কথা জানিয়ে যদি কোন অন্যায় না করে থাকে, এবং কোনকালেই হিন্দুদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার আহবান না জানিয়ে থাকে, কোনকালেই যদি হিন্দু-মুসলিম বিয়ে বা ওপেন রিলেশনশিপে জড়ানোর বিরুদ্ধে কোন কথা না বলে থাকে, তাহলে কিভাবে পিনাকীর ব্যক্তিজীবনে দ্বিমুখিতা, দ্বিচারিতা, ভণ্ডামি খুঁজে পাওয়া সম্ভব? হেফাজতি বা ইসলামবাদী আদর্শ পিনাকী যখন প্রচার করেন, সেসব পড়ে দেখলেও বুঝবেন, সেগুলো ধর্ম নির্বিশেষে সবাইকে মানার বাধ্যবাধকতা তিনি দেন না, বরং সবসময়ই দাবি করেন যে, ইসলাম হচ্ছে সেই উদার ধর্ম - যে অন্য ধর্মের উপরে জুলুম করে না। তিনি হেফাজতি বা ইসলামবাদীদের সমর্থন ও প্রচার করেন এই জায়গা থেকে যে, তারাই আজ দুনিয়াজুড়ে অত্যাচারিত (মজলুম), এবং অত্যাচারিতের অধিকারের পক্ষে, তাদের কন্ঠস্বরের পক্ষে, তাদের রাজনীতির পক্ষে দাঁড়ানোটা যেকোন মানুষের জন্যে কর্তব্য! ফলে, তিনি হিন্দু হিসেবেই মুসলমানদের দাবি ও অধিকারের পক্ষে, নিপীড়িত-নির্যাতিত মুসলমানদের রাজনীতির পক্ষে দাঁড়ান, এবং মুসলিম বিদ্বেষী (তিনি এটাকে ইসলাম-বিদ্বেষী হিসেবে উল্লেখ করেন) পাশ্চাত্য ইহুদী-খৃস্টানবাদী রাজনীতির এবং ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির শেখানো বুলিতে চলা সেক্যুলারিজম ও প্রগতিশীলতার মুখোশ তিনি উন্মোচন করেন, পাশ্চাত্য ও ভারতীয় প্রভুদের অনুগত এদেশীয় সেক্যুলার - প্রগতিশীলদের বিরুদ্ধে তিনি মজলুম মুসলিমের পক্ষে লড়াই চালান, হিন্দু হয়েও! তার এসব আলাপ, যুক্তি ও অবস্থানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো জরুরী, সেগুলোকে ধরে ধরে সারহীন দেখানো যায়, দেখানো দরকার, কিন্তু একদিকে হেফাজতি আদর্শ প্রচার করে, আর অন্যদিকে ব্যক্তিজীবনে তিনি সেই আদর্শের উল্টা আচরণ করে দ্বিমুখিতা- দ্বিচারিতা-অসততা-ভণ্ডামি করছেন - এমন কি আদৌ বলা যাবে? একজন ব্যক্তি খৃস্টান হয়েও নির্যাতিত ইহুদীর পাশে দাঁড়াতে পারে, মুসলিম হয়েও যেভাবে অনেকে হিন্দুদের মন্দির ভাঙ্গার বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাঁড়ান, একজন নাস্তিক মন্দির-মসজিদের বিরুদ্ধে অনেক কথা বলার পরে, নজরুলের মন্দির-মসজিদ ভাঙ্গার কবিতা প্রচার করার পরেও দেখা যায়, যখন এক ধর্মের লোক অন্য ধর্মের মন্দির বা মসজিদ ভাঙ্গে, তখন সেই মন্দির - মসজিদ রক্ষায় এগিয়ে যায়। এগুলোর কোনটাকে ভণ্ডামি বা অসততা বলে না, এগুলোকে বলে মহত্ব, বড়ত্ব! যেভাবে ব্যক্তিজীবনে বিষমকামী হয়ে সমকামীদের অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানো, একজন সিজ জেণ্ডার হয়ে ট্রান্স জেন্ডারের পক্ষে কথা বলা, বাঙালি হয়েও আদিবাসীদের পক্ষে কথা বলা, পুরুষ হয়ে নারীবাদকে প্রচার করা - এসব কোন কিছুর মধ্যেই স্ববিরোধিতা, দ্বিমুখিতা, দ্বিচারিতা নেই!
 
মূলত, এই ভণ্ডামি ও অসততা কিভাবে ও কেন দেখাতে চাচ্ছেন তারা? বা, ঠিক কোন অর্থে পিনাকীর ব্যক্তিজীবনকে ভণ্ডামি বলতে পারেন? কেবলই একজন কাঠমোল্লা বা হেফাজতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই ভণ্ডামি পাওয়া সম্ভব। কেননা, তাদের চোখে হিন্দু হচ্ছে পৌত্তলিক, যারা শিরক করে। কাঠমোল্লার দৃষ্টিকোণ থেকে একজন হিন্দু বা মুশরিককে ধর্মান্তরিত না করে বিয়ে করা মুসলমান নারী বা পুরুষের জন্যে হারাম, কেননা সেই মুশরিক ব্যক্তি মুসলিমকে ধর্মের পথ থেকে সরাতে পারে। একজন কাঠমোল্লার দৃষ্টি থেকে ওপেন রিলেশনশিপ বা বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্ক হচ্ছে ব্যাভিচার বা জেনা। ফলে, তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বলতে পারেন, ইসলামের পক্ষে দাঁড়ানো ব্যক্তিটি ব্যক্তিজীবনে এমন "ন্যাক্কারজনক" কাজ করছে, ছিঃ ছিঃ! ফলে, তাদের কাছে পিনাকী ভণ্ড, অসৎ হতে পারে। কিন্তু যারা হিন্দু থেকে যাওয়া, ধর্মান্তরিত না হওয়া, হিন্দু-মুসলিম বিয়ে বা ওপেন রিলেশনশিপকে ন্যাক্কারজনক বা গর্হিত কাজ মনে করেন না, তারা কেন পিনাকীকে ভণ্ড হিসেবে প্রচার করছেন? তার কারণ কি এই না যে, তারা সেই কাঠমোল্লা, হেফাজতিদের ও পিনাকীর অসংখ্য মুসলিম অনুসারী, গুণমুগ্ধ ভক্তদের চোখ খুলে দিতে চাচ্ছেন? "পিনাকীর অন্ধ মুরিদদের মনে তার বুদ্ধিবৃত্তিক হিপোক্রেসি" তুলে ধরা, "পিনাকী যে আসলেই জনপ্রিয়তা লাভের জন্য হেফাজতের মুখোশ পড়ে আছেন" সেটা উন্মোচন করা - এসবই মূল উদ্দেশ্য যখন হয়, তার অর্থ আসলে কি দাঁড়ায়? সেই অন্ধ মুরিদ বা হেফাজতি- কাঠমোল্লাদেরকে দেখিয়ে দেয়া যে, দেখো পিনাকী আসলে জেনা করছে, পিনাকী আসলে একজন মুশরিক, ইত্যাদি, তাকে শরীয়া মোতাবেক যেখানে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার কথা, সেখানে তোমরা অনুসরণ করছো! কি ভয়ানক অবস্থান, চিন্তা করা যায়! ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সদা লড়াই করনেওয়ালারাই কিভাবে ধর্মান্ধদেরকে ধর্মান্ধতার শিক্ষা দিচ্ছেন, এক পিনাকীকে ঠেকানোর লক্ষে!
 
আদৌ কি এতে ধর্মান্ধরা পিনাকী থেকে মুখ সরিয়ে নিবে বা নিচ্ছে? একজন "বিধর্মী", "মুশরিক" যখন ইসলামবাদী রাজনীতিকে সমর্থন যোগায়, তখন ইসলামবাদীরা যে পরিমাণ উপকার পায়, এরকম বিধর্মী বা হিন্দু সমর্থনকারীর পিঠে সওয়ার হয়ে ইসলামবাদী রাজনীতি তার সমস্ত অপরাধ যেভাবে ঢাকতে বা আড়াল করতে পারে, অন্য কোনভাবে সম্ভব হয় না! এই কারণেই দেখা যায় দুনিয়ার কোন ধর্মের কে কবে ইসলামকে নিয়ে, মুহাম্মাদকে নিয়ে কত বড় কথা বলেছে, সেটা তারা ফলাও করে প্রচার করে। একদিকে হেফাজত - জাগ্রত মুসলিম জনতা প্রভৃতি মন্দিরে কোরআন পাওয়া, হিন্দু অমুক ফেসবুকে কোরআন বা কাবাকে অবমাননা করেছে, নবীকে কটুক্তি করেছে - বলে একদম তুলকালাম করে- হিন্দু মন্দির- বাড়ি ভাংচুর করেছে, অন্যদিকে সেই হিন্দু ধর্মেরই একজন এসে বলছে- এসবই যুবলীগ-ছাত্রলীগের কাজ, বা এদেশে শিবসেনার এজেন্টরা এগুলো করাচ্ছে। ইসলামকে নিয়ে, কোরআন ও নবীকে নিয়ে আজেবাজে কথা বললে তো একজন সাধারণ ধর্মপ্রাণ ব্যক্তির অনুভূতিতে তো আঘাত লাগবেই, তারা খেপবেই। ইত্যাদি। এমন একজনের "হিন্দু" পরিচয় তাদের জন্যে অনেক কার্যকরী, পিনাকীর কথাগুলিই যদি একজন মুসলমান বা ধর্মান্তরিত মুসলমান বলতো, তাতে তার যে প্রভাব, তার চাইতে "হিন্দু হয়েও" পিনাকী যা বলছে তার প্রভাব অনেক বেশী। যেভাবে রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছে- এর প্রমাণে সবচেয়ে বেশি কোট করা হয় রমেশচন্দ্র মজুমদার আর সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাসকে। সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাসের ভিডিও বক্তব্য শেয়ার করার সময়ে ক্যাপশনে প্রায়ই লেখা থাকে "হিন্দু হয়েও" কথাটা, এই "হিন্দু হয়ে" হিন্দু কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিরোধিতার যে ভার, তার তুলনায় সরকার শাহাবুদ্দীন আহমদ কিংবা মোহাম্মদ আবদুল মান্নান এর রবীন্দ্রনাথ বিরোধিতার ভার অনেক কম! এটা হেফাজতিরা ভালো বুঝে বলেই, পিনাকীর মুশরিক-হিন্দু হওয়া নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যথা নেই, তাকে ধর্মান্তরিত করা বরং তাদের জন্যে লস প্রজেক্ট। পিনাকীর ওপেন রিলেশনশিপ, কিংবা তার শরীর দেখানো বডি বিল্ডিং বা নোংরা ভাষায় গালিগালাজ - এসব যখনই কোন কাঠমোল্লাকে দেখাবেন, তারা অবলীলায় বলবে - হিন্দু বলেই এমন, মুসলমান হলে এমন হতো না! এক বাক্যেই আলাপ শেষ, এবং সেই পিনাকীকে তাদের দরকার হবে - ইসলামবাদী রাজনীতির পিঠ চাপড়ে দিতে! এই যে এক হিন্দুর ধর্ম ও ব্যক্তিগত জীবনে ইসলামবাদীরা হস্তক্ষেপ করে না- এবং সে হিন্দু হয়েও মুসলমানদের কাছ থেকে বিরূপতা, ঘৃণার সম্মুখীন হয় না, তাতেই প্রমাণ দেখানো সম্ভব হয় যে, ইসলাম আসলে খুব শান্তির ধর্ম, খুব "সেক্যুলার" একটা ধর্ম! ফলে, জেনা করা কত বড় অপরাধ, তার সাজা মৃত্যুদণ্ড - এসব যতই প্রচার করা হোক, এসব বানী যতই হেফাজতি ও কথিত অন্ধ মুরিদদের মাথায় ঢুকানো হোক, সেগুলো দিয়ে তারা মোটেও পিনাকীকে বর্জন করবে না, বরং আরো অসংখ্য "দুর্বল" মুসলমানের জীবনকেই অতিষ্ঠ করবে!
 
চার
আমার সেই ফেসবুক পোস্টের কমেন্টেই আসিফ মহিউদ্দিন পিনাকীর বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার ব্যাপারটি উদাহরণ সহকারে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন,
"আচ্ছা, আপনি যদি ফেইসবুকে নারীবাদের কান্ডারী সাজেন, নারীর সমান অধিকার নিয়ে ঘণ্টায় তিনবার নাকে কাদেন, এবং ব্যক্তিজীবনে নারীকে ভোগ্যপণ্য ভাবেন এবং আপনার মেয়েকে স্কুলে না পাঠিয়ে আপনার ছেলেকে নামী স্কুলে পাঠান, সেই নিয়ে আমি কী প্রশ্ন তুলতে পারবো? আপনার মত দারুন নিরপেক্ষ ব্যক্তি কী বলে? সেটি ব্যক্তি আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে? মানে, ব্যক্তিজীবনে আমি নামাজ রোজা করে, বাচ্চাকে মাদ্রাসায় পাঠিয়ে, চারবিবি রেখে, দাসী সহবত করে ফেইসবুকে এসে মুক্তচিন্তা নাস্তিকতা নিয়ে নসিহত করতে পারবো?"
আসিফের উদাহরণটি বেশ মজার! আমার পোস্টের আলাপেও আমি বলেছিলাম, "ব্যক্তিজীবন-বাহিরজীবন যেকোন কিছু নিয়েই সমালোচনা থাকলে, অবশ্যই সমালোচনা করা যাবে"! ব্যক্তিজীবনে যদি আমি নারীকে ভোগ্যপণ্যের মত ব্যবহার করি, পুত্র ও কন্যার মাঝে যদি লিঙ্গ অনুযায়ী পার্থক্য করি, তাহলে আমার ফেসবুকে যতই আমি নারীবাদ নিয়ে কাণ্ডারী সাজি বা না সাজি, ঘন্টায় তিনবার নাকি কান্না কাঁদি বা না কাঁদি- আমার সমালোচনা তো যেকেউ করতেই পারে! মানে, যারা জানবে তারা করবে! আমার আত্মীয় স্বজনের মধ্যেও এরকম লক্ষণ যেগুলো কাছ থেকে দেখেছি, আমি সমালোচনা করেছি, করি। বুঝানোর চেষ্টা করি! আমার নিজেরও তো হাজারো সমস্যা-সংকট ছিল, আছে- যারা জানে, কাছ থেকে যারা দেখে, জানে- সমালোচনা করে, সমস্যা কি? কিন্তু প্রশ্নটা তো বস্তুত উল্টো! আপনার উদাহরণটিকেই যদি উল্টে দেই, ধরেন একজন লোক প্রকাশ্যে নারীবাদের মারাত্মক বিরোধী, কিন্তু ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে যথেষ্ট নারীদের প্রতি দারুণ শ্রদ্ধাশীল, নিজের স্ত্রীর সাথে তার মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক, স্ত্রীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় বাঁধা দেয় না, কিংবা নিজের কন্যা সন্তানকে পুত্র সন্তানের চাইতেও ভালোবাসে- এসব ক্ষেত্রে আমাদের আপত্তির জায়গাটা কি হবে? নারীবাদের বিরোধী হয়েও ব্যক্তিজীবনে কেন সে নারীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কেন কন্যা সন্তানকে গুরুত্ব দেয়, কেন কন্যাকে স্বাবলম্বী হতে উৎসাহিত করে? এসব বলে তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবো, নাকি তার নারীবাদ নিয়ে বিরোধ, আপত্তির জায়গাগুলো ধরে সমালোচনা করবো?

আসিফ মহিউদ্দীন একই রকম আরো কিছু উদাহরণ দিয়েছেন, পিনাকীর ভণ্ডামী বুঝাতে এবং কেন ও কিভাবে পিনাকীর ব্যক্তিজীবন নিয়ে কথা বলা উচিৎ তার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে। তিনি বলেছেন,
"ধরুন ফেইসবুকে নারীর অধিকার নিয়ে জ্বালাময়ী স্ট্যাটাস লেখা কোন নারী যদি ব্যক্তিজীবনে কাজের মেয়েকে মারধোর করে, বা নারীবাদী লেখক কোন পুরুষ যদি অফিসে মেয়েদের যৌন নির্যাতন করে, তাহলে ঐগুলা কী আর ব্যক্তিগত বিষয় থাকে? নিজের প্রচারিত মতাদর্শের একদম উল্টোটা যদি ব্যক্তিজীবনে দেখা যায়, তা নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না?"
খুব সহজ হিসাব! কাজের মেয়েকে মারধোর করা ফৌজদারি অপরাধ! ফলে, ফেসবুকে নারীর অধিকার নিয়ে জ্বালাময়ী কথা বলুক বা না বলুক, যে এই কাজ করবে, তার বিরুদ্ধে শুধু সমালোচনা না, এমনকি আইনের হাতেও সোপর্দ করা যেতে পারে। কিংবা কাজের মেয়েটি যদি শিশু হয়, মারধর করা সেই কথিত নারীটির শিশুশ্রম নিয়ে ফেসবুকে কোন বক্তব্য না থাকলেও তার বিরুদ্ধে কথা বলা, সমালোচনা করা যায়, দরকার। ফেসবুকে নারী অধিকারের পক্ষে বা শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে বড় বড় কথা বলে এমন কাজে লিপ্ত হলে, তাকে ভণ্ড, অসৎ, দ্বিমুখী- এসবও বলা যায়। সেই নারীর সমালোচনা করা, বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া, ভণ্ড-অসৎ বলার প্রসঙ্গটা আসছে, কেননা ব্যক্তিজীবনে তার অপরাধ, বা সমস্যা আছে। কিন্তু এই উদাহরণগুলোর সবই পিনাকীর ঘটনার ঠিক উল্টো ধরণের হয়ে যাচ্ছে। ধরা যাক, এক নারী নিজে বাসায় কোন কাজের মেয়ে রাখে না (কিংবা রাখলেও নিজের মেয়ের মত যত্ন নেয়- স্কুলে পাঠায়), কিন্তু ফেসবুকে এক চাকুরীজীবি মায়ের পক্ষ নিয়ে কাজের মেয়েরা-বুয়ারা কত সমস্যা করে, বাচ্চারা সেইফ না- এসব যুক্তি তুলে ধরে কাজের মেয়েকে প্রহার করা আরেক নারীর পক্ষে অবস্থান নিলো ! এখন কি বলবেন? সেই সব যুক্তির সমস্যা নিয়ে আলাপ করবেন? নাকি, নিজের কাজের মেয়েকে না মেরে কেন আরেকজন যে কাজের মেয়েকে বেদম মেরেছে, তার পক্ষ নেয়াটা কতবড় হিপোক্রেসি- সেটা তুলে ধরবেন?
"পিনাকী কেন মেনন ইনুর ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস আর হজ্ব নিয়ে কটাক্ষ করে? সে নিজে যা করে, অন্য একজন ঠিক একই কাজ তার সাথে করলে সেটা অন্যায়?"  
মেনন ও ইনুর হজ্ব পালন নিয়ে পিনাকী কি কটাক্ষ করেছেন আমার জানা নেই। কিন্তু রাষ্ট্রীয় টাকায় ঘটা করে হজ্ব করে, হজ্বের পোশাকে ফটোসেশন করার পরেও, সেটা কিভাবে ব্যক্তিগত ডোমেইনে থাকে, সেটাই তো বুঝতে পারছি না! আমিও মেনন ও ইনুর হজ্ব পালন নিয়ে আপত্তি করেছি, রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় করাকে অপরাধ মনে করি, সে জায়গা থেকে। শেখ হাসিনার ভোটের আগে তসবিহ হাতের সেই ছবি, বা তাহাজুদ্দের নামাজের গল্প সংসদে দাঁড়িয়ে জানান দেয়া, এরশাদের জুম্মার নামাজের খবর বিটিভিতে ভিডিও সমেত প্রচার করা- এসবের কোনটাই তো আর ব্যক্তিগত থাকে না, পাবলিক ডোমেইনে চলে আসে, কেননা জনগণকে ধর্মীয়ভাবে প্রভাবিত করাকে আমি সমাজের জন্য ক্ষতিকর মনে করি। সেসব নিয়া কথা বলা, আপত্তি করা, কটাক্ষ করার সাথে ব্যক্তিগত পর্যায়ে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, ধর্মকর্ম পালন নিয়ে আপত্তি করা বা প্রশ্ন তুলার মূলগত পার্থক্য আছে। অর্থাৎ এরশাদ কেন জুম্মা নামাজ বা ঈদের নামাজ পড়লেন, বা শেখ হাসিনা কেন তাসবিহ গুনেন, তাহাজ্জুদের নামাজ পড়েন, সেটি কখনই আমার প্রশ্ন নয় বা সমালোচনার জায়গা নয়, বরং তারা কেন রাজনীতির পাবলিক স্ফিয়ারে তাদের ব্যক্তিগত ধর্মীয় আচরণগুলোকে নিয়ে আসছেন, রাজনীতিতে কেন ধর্মের ব্যবহার করছেন, আমার সমালোচনার জায়গা সেটি। এর সাথে মেনন ও ইনুর ক্ষেত্রে আরেকটি সমালোচনা যুক্ত হতে পারে, তাদের এককালের বামপন্থী ও মার্কসবাদী রাজনীতির চর্চা। অনেকে সেই জায়গা থেকেও সমালোচনা করে, তাদেরকে অসৎ, ভণ্ড বলেছেন। আমি অবশ্য সেই সমালোচনা করি না, কেননা যেই মুহুর্তে তারা ১৪ দলে যোগ দিয়ে বুর্জোয়া রাজনীতির ঘাড়ে সওয়ার হয়েছেন, গণ মানুষের ও শ্রমিক শ্রেণীর রাজনীতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী রাজনীতির তল্পিবাহক হয়েছেন, তখন থেকেই তো তাদের আর বামপন্থী হিসেবে স্বীকার করি না। ভণ্ডামি, অসততা, দ্বিমুখিতা, দ্বিচারিতা যা করার তারা সেই সময় থেকেই করেছেন, ভিকারুন্নেসা স্কুল কমিটির দায়িত্ব পালন কালে চুরি চামারি বলি, আর রাষ্ট্রীয় অর্থে হজ্বে যাওয়া বলি- সবই তো সেই ভণ্ডামি ও অসততারই ধারাবাহিকতা মাত্র।
 
মেনন ও ইনুর হজ্ব পালনের চাইতে বরং মঞ্জুরুল আহসান খানের হজ্বে গমন প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা এক্ষেত্রে বরং আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হবে। সে সময়ে আমিও এ নিয়ে সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীদের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম। ছাত্র ইউনিয়নের কিছু প্রাক্তন কর্মী জানিয়েছিলেন, মঞ্জুরুল আহসান খান নাকি ব্যক্তিগত জীবনে একজন বিশ্বাসী মানুষ। সেক্যুলার, কিন্তু নন-প্রাক্টিসিং মুসলিম। একজন বিশ্বাসী বামপন্থী মানুষের ব্যক্তিগত ধর্মচর্চা নিয়ে আমার কোন প্রশ্ন বা সমালোচনার জায়গা নেই, ফলে মঞ্জুরুল আহসান খান কেন হজ্বে গেলেন - সেটি নিয়ে আর প্রশ্ন করিনি বা সমালোচনা করিনি। তবে আমি মনে করেছি, তিনি মার্কসবাদী নন, দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী নন, কেননা একজন ধার্মিক, আস্তিক বা বিশ্বাসী ব্যক্তি মাত্রই ভাববাদী, মোটেও বস্তুবাদী নয়। আমার সমালোচনা বলতে গেলে অতটুকুই। আমি কেবল প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি কি কখনো কর্মীদের সামনে মার্কসবাদ ও দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের পাঠ দেননি? কি বলেছিলেন তখন? মঞ্জুরুল আহসান খানের ব্যাপারে আমি জানি না, তবে বাসদ নেতা কমরেড খালেকুজ্জামান বা কমরেড মুবিনুল হায়দার চৌধুরী যেভাবে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের (ও নাস্তিকতার) পাঠ কর্মীদের দিতেন, তার পরে তারা যদি নিজেরা নামাজ, রোজা পড়তেন, হজ্ব করতেন, তাহলে নিশ্চিতভাবেই তাদেরকে ভণ্ড, অসৎ বলতাম। কমরেড খালেকুজ্জামান ও বজলুর রশিদ চৌধুরী শ্রমিক শ্রেণীর রাজনীতি করে যখন শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করতে যান, তখন তাদেরকে ভণ্ড বলে সমালোচনা করি। কেননা সেক্ষেত্রে তাদের রাজনৈতিক শিক্ষা ও আদর্শ আর কর্ম বিরোধাত্মক। মঞ্জুরুল আহসান খানের রাজনৈতিক দর্শন ও চর্চা সম্পর্কে জানা নেই বিধায় হজ্বে গমনকে তাই ভণ্ডামি - অসততা বলছি না। তবে, তাকে মার্কসবাদী বা দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী বলেও আর মনে করি না। মওলানা ভাসানীর ধর্ম পালন, পীরগিরি নিয়েও আমার কোন সমালোচনা নেই, তবে তাকেও আমি কখনই মার্কসবাদী - বস্তুবাদী মনে করি না (তিনি সেই দাবি করেনও না)! আমার বাবা ও তার বন্ধু বান্ধব সার্কেলে এই সিপিবি ও মোজাফফর ন্যাপ ওরিয়েন্টেড লোকজন প্রচুর। ব্যক্তিগত জীবনে অবিশ্বাসীই মনে হতো, কিন্তু আবার তাদেরকেই দেখতাম গ্রামেগঞ্জে ঘটা করে ধর্মকর্ম পালন করছেন, জুম্মার ও ঈদের নামাজ পড়ছেন, বিভিন্ন পূজা উৎসবে অংশ নিচ্ছেন। বাম রাজনীতি করা সেই কাকাদের এমন ধর্মকর্ম করা নিয়ে প্রশ্ন করায় বলেছিলেন, তারা ধার্মিক নন বা তারা ধর্ম পালন করেন না, তারা এসব কিছুকেই সংস্কৃতি হিসেবে দেখেন এবং জনগণের সংস্কৃতিতে অংশ নেন মাত্র। যুক্তি হিসেবে ভালো, কিন্তু পরে সিপিবি'র জেলা বা শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের কাউকে কাউকে ধার্মিক বা আস্তিক হিসেবে পেয়ে মনে হয়েছে, কোথায় যেন তারা মার্কসবাদের চর্চা, তথা দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের দার্শনিক চর্চা থেকে সরে যাচ্ছেন।
 
এখন, মূল প্রশ্নে আসি। ভণ্ডামি ও অসততা বলতে যদি আমি বুঝে থাকি- যে আদর্শ ধারণ করি বলে প্রচার করি ও অন্যকে যে আদর্শে উদ্বুদ্ধ করি, সেই আদর্শের বিপরীত কর্ম ব্যক্তিগত জীবনে করলে, তাকে ভণ্ডামি, অসততা, দ্বিমুখিতা, দ্বিচারিতা বলা হয়, তাহলে পিনাকীর প্রচারিত ইসলামবাদী আদর্শ আর তার ব্যক্তিগত জীবনে সেক্যুলার সুবিধাভোগকে (যেমন ধর্মান্তরিত না হয়েই হিন্দু-মুসলিম বিয়ে) ভণ্ডামি বলা যাবে কি না? হ্যাঁ, এই অর্থে পিনাকীকে ভণ্ড বলা যেত, যদি পিনাকী হিন্দু ও বিধর্মীকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করে, নিজে হিন্দু ধর্মকে আঁকড়ে ধরতেন। যদি তিনি আন্তঃধর্ম বিয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে, ধর্মান্তরিত না হয়েই হিন্দু-মুসলিম বিয়েকে জেনা বলে প্রিচ করে এবং তার জন্যে মৃত্যুদণ্ড দাবি করে, নিজে ঠিকই হিন্দু-মুসলিম বিয়ে করতেন, তাহলেও তাকে ভণ্ড বলা যেত। কিন্তু, তিনি তো এরকম দ্বিমুখিতা-দ্বিচারিতা কখনো করেননি, তাহলে কিভাবে এটা অসততা-ভণ্ডামি হবে?
 
আসিফ মহিউদ্দিন সেই আলাপে পিনাকীর সাথে সাথে ফরহাদ মাজহারেরও সমালোচনা এনেছিলেন। একই রকম সমালোচনাঃ
"ফরহাদ মজহার দীর্ঘসময় লিভ টুগেদার সম্পর্কে ছিলেন। অসংখ্য নারীর সাথে তার বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক ছিল। তা উনার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু প্রকাশ্যে তিনি ইসলামী জিহাদের সমর্থন করেন। দেশে ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার জন্য লেখালেখি করেন। শরীয়ার পক্ষে সাফাই গান। হেফাজতের সমর্থন করেন। ১৩ দফার সমর্থন করেন। জিজ্ঞেস করাটা কী অন্যায় যে, তিনি যেই মতাদর্শের সমর্থক, তার প্রয়োগ ব্যক্তিজীবনে কতটা? শরীয়া আইনে লিভ টুগেদারের শাস্তি কী? শরীয়া কায়েম হলে তার শাস্তি কী হবে?"  
খুবই আজব ধরণের সমালোচনা! একবার বলছেন, লিভ টুগেদার বা বিবাহিত বহির্ভুত নারীর সাথে সম্পর্ক "উনার ব্যক্তিগত বিষয়", আবার সেই ব্যক্তিগত বিষয়ই তিনি সকলের আলাপের বিষয় বানিয়ে ফেলছেন! “অসংখ্য নারীর সাথে বিবাহ বহির্ভুত সম্পর্ক”- এই কথাটার ভিত্তি কি, এই তথ্যের জরুরতই বা কি? এসবকে "ব্যক্তিগত বিষয়" বলে পাশে "কিন্তু" যুক্ত করে দিয়ে, ইসলামী জিহাদ সমর্থন, ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা, হেফাজতের ১৩ দফা সমর্থন নিয়ে ফরহাদ মাজহার যেসব লেখালেখি করেন- তার সাথে ব্যক্তিজীবনে প্রয়োগ কতটা, সেই প্রশ্ন তুলেছেন। ফরহাদ মাজহার ইসলামী জিহাদকে সমর্থন করেন, সাম্রাজ্যবাদকে মোকাবেলার অংশ হিসেবে, এমনকি দেশে ফ্যাসিবাদ মোকাবেলায় জামাত – বিএনপি- হেফাজতকেও সমর্থন করেন। হেফাজতি উত্থানকে তিনি দেশের একদম প্রান্তিক, গরীব মানুষের উত্থান হিসেবে দেখিয়ে, ১৩ দফাকে ধর্মপ্রাণ আম পাবলিকের নিজস্ব ভয়েস হিসেবে হাজির করেছেন। এসবকিছু নিয়েই ধরে ধরে কথা বলা যায়, কথা বলা দরকারও! কিন্তু শরীয়া আইন আসুক, লিভ টুগেদারের তথা জেনার শাস্তির বিধান হোক, এসবের পক্ষে কি ফরহাদ মাজহার কখনো ওকালতি করেছেন? অন্যদের লিভ টুগেদার করার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন কখনো তিনি? তাহলে, তিনি নিজে কেন লিভ টুগেদার করেন, প্রশ্ন করে তাকে হিপোক্রেট বলা যাবে? ফরহাদ মাজহারকে নিয়ে গড়ে বড়ে কিছু বলা ও সমালোচনা করার আগে তার চিন্তার সাথে পরিচিত হওয়া দরকার। লালন ভক্ত ফরহাদ মাজহারের ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস কি বা কেমন? তিনি ইসলামবাদী রাজনীতিকে সমর্থন করেন কোন জায়গা থেকে? আমাদের দেশে ভারতীয় আগ্রাসন ও পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি যে ইসলামে ভর করেন, সেই ইসলাম কি সালাফিস্টদের ইসলাম? এবং গোটা দুনিয়াতেই মুসলমানের উপরে ওয়ার অন টেররের নামে সাম্রাজ্যবাদীদের নিপীড়ন ও আক্রমণের বিরুদ্ধে মজলুম মুসলমানের লড়াই বা ইসলামী জিহাদের মাধ্যমে কোন ধরণের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন? এই প্রশ্নগুলোর জবাবের মধ্যেই আসলে বুঝা যাবে, ফরহাদ মাজহারের ব্যক্তিজীবনের কথিত লাইফ স্টাইল, তার আদর্শিক চিন্তার সাথে সাংঘষিক কি না। এখানে ফরহাদ মাজহারকে নিয়ে বিস্তারিত আলাপের সুযোগ নেই। কেবল, এতটুকুই বলছি - ফরহাদ মাজহারের চিন্তা ও যুক্তির মাঝে অসংখ্য ফ্যালাসি আছে, মিথ্যা - কপটতা - ভণ্ডামিও আছে, তার চিন্তার মাঝে পরতে পরতে বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা আমি খুঁজে পাই, কিন্তু নিজস্ব অবস্থান থেকে হেফাজতি - ইসলামবাদী রাজনীতি সমর্থনের সাথে তার ব্যক্তিজীবনের কথিত চর্চাগুলোর (লিভ টুগেদার, নারীর সাথে বিবাহ বহিভূর্ত সম্পর্ক) কোন রকম সংঘর্ষ নেই বা ভণ্ডামি-অসততা আমি খুঁজে পাই না।

এরপরে আসিফ, পিনাকী ভট্টাচার্যের পুরাতন এক লেখার সূত্র টেনেছেন, যেখানে পিনাকী বলেছিলেন - ইউরোপে সেক্যুলারিজমের দরকার থাকলেও আমাদের দেশে তার কোন দরকার নাই, আর জরুরত না থাকলে এ দেশে সেক্যুলারিজমের জন্যে জান কোরবান করে দেয়ারও কোন কারণ নাই। পিনাকীর সেই আলোচনা উল্লেখ করে, আসিফ মহিউদ্দীন প্রশ্ন করেছেন,
"তার এবং তার স্ত্রীর বিবাহ যদি সেক্যুলার কায়দায় হয়ে থাকে, সেখানে প্রশ্ন ওঠে, আমাদের দেশের জন্য সেক্যুলারিজমের দরকার না হয়ে থাকলে, উনি কেন সেই কায়দায় বিবাহ করলেন? উনি ব্যক্তি জীবনে সেক্যুলার রাষ্ট্রের সুবিধাটুকু নেবেন, আবার বলবেন আমাদের জন্য সেক্যুলারিজমের কোন দরকার নাই, এটা কেমন কথা?" 
পিনাকীর সেক্যুলারিজম সংক্রান্ত পোস্টটি (এখন ফেসবুকের সেই লিংক কাজ করে না, সম্ভবত পিনাকীর সেই আইডি ডিলিট বা ব্লক হয়ে গিয়েছে) ফ্যালাসি ও মিথ্যা ইতিহাসে ভরপুর, সেগুলো খুব সহজেই ধরিয়ে দেয়া যায়, সেখান থেকে টানা সিদ্ধান্তের (বাংলাদেশে সেক্যুলারিজমের জন্যে জান কোরবান করার কারণ নেই) জবাবও সুন্দরভাবে দেয়া যায়, পিনাকীর পোস্টেই বেশ কয়েকজন জবাব দিয়েওছে! কিন্তু, আসিফ যেভাবে ব্যক্তিজীবনে সেক্যুলারিজমের সুফল ভোগ করে, পিনাকীর সেক্যুলারিজম-বিরোধিতাকে স্ববিরোধিতা হিসেবে উপস্থিত করলেন, তাতে পিনাকীর পোস্টের অন্তর্নিহিত রাজনীতিটা আসিফ ঠিকমত ধরতে পারেননি বলেই বোধ হচ্ছে! পিনাকীর বক্তব্যে ইউরোপে সেক্যুলারিজমের ইতিহাসের সাথে রাজতন্ত্র ও চার্চের গাটছাড়া সম্পর্ক, রাষ্ট্রের উপরে ধর্মের প্রবল প্রভাব, এসবের যে ফিরিস্তি আছে- সেটার মূল জায়গাই হচ্ছে এটা দেখানো যে, সে কারণেই ইউরোপে সেক্যুলারিজমের জন্যে জানপাত করার এত দরকার ছিল, কিন্তু এখানে আমাদের মত মুসলিম দেশে ধর্ম কখনোই রাষ্ট্রের উপরে সেইভাবে প্রভাব ফেলে নাই (কিংবা তার মতে ইসলাম সব ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দেয়, রাষ্ট্রের উপরে খবরদারি করে না), ফলে ইউরোপের অনুকরণে সেক্যুলারিজম নিয়া আমাদের এত চিল্লাচিল্লির কিছু নেই। এই হচ্ছে তার বক্তব্যের সারকথা। অর্থাৎ সেক্যুলারিজমের বিরুদ্ধে, তথা ইউরোপে রাষ্ট্রের উপরে চার্চের খবরদারি ছেটে ফেলার বিরুদ্ধে তিনি কিন্তু কথা বলেননি বা সেক্যুলারিজমেরই কোন দরকার নেই - ছিল না - এমন কিছু তিনি বলেননি। তিনি কেবল এটাই বুঝাতে চেয়েছেন যে, আমাদের এখানে কখনোই সেই খবরদারিটাই ছিল না (এর আরেক অর্থ হচ্ছে, এখানে সবসময়ই সেক্যুলারিজম ছিল আছে, বা ইসলাম সম্পূর্ণভাবেই একটা সেক্যুলার ধর্ম)। ফলে, পিনাকী তার বিবাহের ক্ষেত্রে যে সেক্যুলার প্রথার সুফল ভোগ করছেন সেই সেক্যুলারিজমের বিরোধিতা কেন করছেন, সেটা যদি তাকে প্রশ্ন করা হয়, তিনি হয়তো সুন্দর মতন জবাব দিবেন এভাবে, কি সুন্দর "সেক্যুলার" একটা সমাজে বাস করছি বলেই না এই প্রথায় বিবাহ করতে পেরেছি! এখানে সমস্যা কোথায়? তোমরা কোন সেক্যুলারিজমের জন্যে তাহলে জান কোরবান করছো?
 
 
পাঁচ
পুলক ঘটক আমার ফেসবুক পোস্টের জবাবে আরেকটি পোস্ট লিখেছিলেন। সেই পোস্টের অধিকাংশ বক্তব্য বা যুক্তির জবাব মূলত আমার মূল পোস্টে এবং কমেন্টে অনেকের প্রশ্নের জবাবে করে ফেলেছি। দুই-একটি পয়েন্টে সে সময়ে জবাব দেয়া হয়নি। তিনি বলেছেন,   
"বিয়ের কথা বাদ দিলে “ওপেন রিলেশনশিপ“ নিয়ে আপত্তি কেবল কাঠমোল্লাদের বা হেফাজতিদের; মুক্তমনা ব্লগারদের ওপেন রিলেশনশিপ নিয়ে কোনো আপত্তি বা ভিন্নমত নেই- এটা মোটেই সঠিক নয়"। 
"ওপেন রিলেশনশিপ" হচ্ছে একটা বিশেষ ধরণের সম্পর্ক, এ নিয়ে ভিন্নমতের কি থাকতে পারে, তা আমার বোধগম্য নয়। এমনকি কাঠমোল্লাদের মাঝেও এ নিয়ে ভিন্নমত থাকার কিছু নেই। যেটা তাদের থাকে, তা হচ্ছে তীব্র আপত্তি। গা ঘিন ঘিনে একটা ঘৃণাভাব। কেননা, যেকোন বিবাহ বহির্ভূত যৌনতাই হচ্ছে ব্যভিচার বা জেনা। আর, নারীর বহুগামিতা মানেই হচ্ছে - সেই নারী নষ্টা, বেশ্যা। তারা বিয়ে করা দম্পতির পারস্পরিক সম্মতিতে অন্য নারী বা পুরুষের সাথে মিলিত হওয়ার কথা চিন্তাও করতে পারে না বিধায় তাদের মাঝে এই তীব্র আপত্তি তৈরি হয়! কিন্তু, মুক্তমনা ব্লগার বা যেকোন আধুনিক, সেক্যুলার, প্রগতিশীল ব্যক্তির এমন ওপেন রিলেশনশিপের ব্যাপারে আপত্তি থাকার কি আছে, সেটাও আমার বোধগম্য নয়। যতখানি বুঝতে পারছি, পুলক ঘটক খুব সম্ভবত নিজে এরকম ওপেন রিলেশনশিপের বিষয়টি হজম করতে পারছেন না, তিনি এই তীব্র আপত্তি ধারণ করেন বিধায়, এভাবে নিজের আপত্তিকে মুক্তমনা ব্লগারদের উপরে চাপিয়ে দিয়েছেন! এখন, পুলক ঘটকের এই "আপত্তি"র কারণ আসলে কি? সেটি আমার প্রতি ছুড়ে দেয়া তার একটি প্রশ্ন থেকে বুঝা যাবে, 
"আমি যদি আমাদের নাধ ভাইকে বলি, ‘আপনি এবং আপনার স্ত্রী ওপেন রিলেশনে আছেন’ তাহলে আপনিও তো পিনাকীর মত তেড়ে আসবেন - এখন যেভাবে এসেছেন"!
এই যে পুলক ঘটক বলেছেন আমি তেড়ে আসবো, আসলে সেটা এমন পরিস্থিতিতে তিনি নিজে কি করবেন, সেটিই আমার উপরে চাপিয়েছেন। অবশ্য, যেকোন দম্পতি বা জুটি পরস্পরের সাথে কিরকম সম্পর্কে লিপ্ত বা কেমন সম্পর্কের চর্চা করেন, সেটা অন্যের বলার কোন রকম এখতিয়ার থাকে না। আর, যেরকম সম্পর্কে তারা নেই, বা নিজেরা যেরকম সম্পর্কে যাওয়ার কথা চিন্তাও করে না, সেরকম একটা সম্পর্কে তারা আছে - এমনটা বলে দিলে সেই দম্পতি ক্ষিপ্ত হতেই পারে। আসলে পুলক ঘটকের প্রশ্নটা হতে পারে এমন, আমি ও আমার স্ত্রী ওপেন রিলেশনে আছি কি? - এই প্রশ্ন করলে তেড়ে যাব কেন, আমার জবাব দিতে ইচ্ছে না করলে বড়জোর বলতে পারি, আমি ব্যক্তিগত বিষয়ে প্রশ্নের জবাব দিতে বাধ্য নই বা অনিচ্ছুক। আমার অবশ্য এই প্রশ্নের জবাব দিতে সমস্যা নেই, আমার জবাব হচ্ছে- না, আমরা কোন রকম ওপেন রিলেশনশিপের মাঝে নেই। আমাদের সম্পর্ক (প্রেম ও বিয়ে) হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত আমরা পুরোপুরি মনোগামাস (এখন পর্যন্ত বলেছি, ভবিষ্যতের কথা আমাদের দুজনের কেউই জানি না)। এখন, পুলক ঘটক প্রশ্ন করতে পারেন, আমি ও আমার স্ত্রী এরকম ওপেন রিলেশনশিপে যেতে এখন আগ্রহী হবো কি না, রাজী হবো কি না, বা পারবো কি না! এই প্রশ্নের জবাবেও বলবো- না, রাজী হবো না, পারবো না। তবে, আগ্রহ যে কখনো হয়নি বা ভনিষ্যতে কোন কালেই আগ্রহ হবেও না, সেটা অবশ্য বলতে পারছি না। বস্তুত, এরকম ওপেন রিলেশনশিপের কথা প্রথম জানতে পেরেছি - জা পল সার্ত্র ও সিমোন দ্য বোভোয়া - এই দুজনের সম্পর্ক থেকে। তাদের মাঝে শেষ জীবন পর্যন্ত দারুণ সম্পর্ক বজায় ছিল, কিন্তু তাঁরা কখনো বিয়ে করেননি, এমনকি সবসময় লিভ টুগেদারও করেন নি, আবার তাঁরা মনোগামাসও ছিলেন না। এই সম্পর্কটি আমাকে খুব আকর্ষণ করেছিলো - অনেক ভাবিয়েছিলো, চিন্তার খোরাক দিয়েছিলো, নর-নারী প্রেম-ভালোবাসা-যৌনতার সম্পর্ক নিয়ে নতুন ভাবে চিন্তার খোরাক দিয়েছিলো। একটা সম্পর্ক হলেই দুজনকে সারাজীবন একসাথে ঝুলে থাকতে হবে কেন, একে অপরকে দখল করে রাখতে হবে কেন, এই প্রশ্নের জায়গা থেকে আমার কাছে এমন ওপেন সম্পর্ককেই আদর্শ সম্পর্ক বলে মনে হয়েছে। কিন্তু, নিজে যখন প্রেম ও বিয়ের সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছি, নিজেদের ক্ষেত্রে সেরকম হতে পারিনি। মানে, আমার প্রেমিকা বা স্ত্রীকে অন্য কারোর সাথে "শেয়ার" কথা চিন্তাও করতে পারিনি, আমার স্ত্রীও আমাকে অন্য নারীর সংস্পর্শে যাওয়ার কথা চিন্তাও করতে পারে না। হয়তো মুখে বলেছি, বা মজা করেছি, সে যদি কখনো কারোর সাথে সম্পর্কে লিপ্ত হয়, তাহলে আমিও আরেকজনের সাথে লিপ্ত হবো। কিন্তু আমার ধারণা, এরকম ক্ষেত্রে আমরা আসলে সম্পর্কচ্ছেদের দিকেই যাবো! অতএব, বুঝতেই পারছেন - আমরা ওপেন রিলেশনশিপের চর্চা করি না, এবং এরকম সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার কথা নিজেদের ক্ষেত্রে কল্পনাও করতে পারি না, খুব সম্ভব আপনার নিজের ক্ষেত্রেও বিষয়টি এমন! 
 
কিন্তু, এটাকে কি ওপেন রিলেশনশিপের ব্যাপারে আমার "আপত্তি" বলা যাবে? আমি তা মনে করি না! একটা হচ্ছে ব্যক্তির চয়েস, আরেকটা হচ্ছে অন্যের চয়েস এর ব্যাপারে শ্রদ্ধার বিষয়। মানে, আমি নিজে বিষমকামী, কিন্তু অন্য কারোর সমকামিতা নিয়ে আমার কোন আপত্তি তো দূরের কথা, হেডেক পর্যন্ত নেই। এটা অনেকটা এরকম, আমি নিজে করল্লা খেতে অপছন্দ করি, আমি খাবো না। কিন্তু অন্যকে কি করল্লা খেতে বাঁধা দিতে পারি? বা আমার নিজের জন্যে খুব উজ্জ্বল - চকচকে পোশাক পরতে পছন্দ করি না, আমার এই পছন্দ অন্যের উপরে চাপাতে পারি কি? একই ভাবে, মনোগামী হওয়াটা আমার চয়েস হতে পারে, কিন্তু অন্যের বহুগামিতা নিয়ে আমি কি বাঁধা দেয়া, সমালোচনা - গালমন্দ করা, সাজার ব্যবস্থা করা, এসব কি করতে পারি, যদি সেখানে কোন রকম অন্যায় বা অপরাধ কর্ম না ঘটে থাকে? ফলে, পুলক ঘটকের বুঝতে হবে - মানুষের কোন একটা নিরীহ চর্চা, অভ্যাস, বা রুচিকে সমর্থন জানানো, তার ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানোর জন্যে, নিজের মধ্যেও সেই চর্চা অভ্যাস গড়ে তুলাটা পূর্বশর্ত হিসেবে থাকে না! মানে, সমকামীদের অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানো মানে যেমন নিজেরও সমকামী না হওয়া, তেমনি নিজে বিষমকামী হওয়া, বা নিজের জন্যে সমকামী হওয়াটা যতই অকল্পনীয় হোক, যতই গা ঘিন ঘিনে ভাব তৈরি করুক, তার অর্থ কখনই সমকামী জুটির প্রেম - ভালোবাসা - যৌনতার প্রতি আপত্তি নয়! নিজের পছন্দ, রুচি, অভ্যাস, সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন, যৌনাভ্যাস প্রভৃতি অন্যের উপরে চাপিয়ে দেয়া, অন্যকে মূল্যায়ন বা বিচার করা, অন্যকে নিজের মত হতে বাধ্য করা, অন্যের ভিন্নরকম অভ্যাসের বাঁধা দেয়া, আপত্তি করা, "পৃথিবীর পূর্ব পশ্চিম" কোথাও আছে কি না, কত "বিরল ও ব্যতিক্রম" বলে সেই বিরল ও ব্যতিক্রম-এর চর্চাকে ডেমোনাইজ করা, খুবই অন্যায় আচরণ। ফলে, কাঠমোল্লা, হেফাজতিদের মত অন্য মানুষের ভিন্ন রকম সম্পর্কের চর্চা, যৌনতা - প্রভৃতি নিয়ে একই রকম আপত্তি থাকলে কেউ কখনো "মুক্তমনা", "প্রগতিশীল" থাকতে পারে বলে আমি আসলেই মনে করি না। আমি অবাক হয়ে আসলে পুলক ঘটকের এহেন "আপত্তি"র জায়গাই দেখেছি। তিনি জানিয়েছেন,  
"আসলে পূর্ব থেকে পশ্চিম -পৃথিবীর কোথাও ওপেন রিলেশনের বড় কোনও সমাজ নেই। ... হ্যা, পৃথিবী জুড়ে পরকিয়া আছে, যৌনতার চৌর্যবৃত্তি আছে এবং ধরা পরার পর সম্পর্ক বিচ্ছেদের ঘটনা আছে। কিন্তু দম্পতির পরস্পরের সম্মতিতে ওপেন রিলেশন বিরল ও ব্যতিক্রম। অথচ নাধ অবলীলায় বলে দিলেন, ওপেন রিলেশনশিপ নিয়ে আপত্তি কেবল কাঠমোল্লাদের! একদম স্ববিরোধী কথা"
কি গোলমেলে চিন্তা! সংখ্যার বিচারে সমর্থন বা আপত্তি জানানোটা কোন ধরণের নৈতিকতা? বাংলাদেশের মত সমাজে নাস্তিকতা কি খুব সাধারণ ও নৈমত্তিক? আমি যে সময়ে, যে বয়সে নাস্তিক হয়েছি, তখন আমার স্কুলে, পাড়া মহল্লায়- কোথাও কোন নাস্তিক পাই নি, সবচেয়ে বিরল ও ব্যতিক্রম প্রজাতি ছিল নাস্তিকরাই। গোটা দুনিয়ায় মানুষ প্রধানত বিষমকামী, সমকামীরা পার্সেন্টেজ হিসাব করলে খুব বিরল ও ব্যতিক্রম। হিজড়ারা, রূপান্তরকামীরা, আন্তঃলিঙ্গরা বিরল ও ব্যতিক্রম! বিরল ও ব্যতিক্রম হলেই, তাদের প্রতি আপত্তি করাটা সংখ্যাগরিষ্ঠের অধিকার হয়ে যেতে পারে কি? কি ভয়ানক ও কত প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তা! 
 
পুলক ঘটক কিন্তু নিজেও জানাচ্ছেন, পৃথিবী জুড়ে পরকিয়া আছে, যৌনতার চৌর্যবৃত্তি আছে! এখন পৃথিবী জুড়ে আছে বলেই পরকিয়া ও যৌনতার চৌর্যবৃত্তিকে সমর্থন জুগিয়ে যেতে হবে? না, আমি এমনটা মনে করি না। আমার কাছে, পরকিয়া ও যৌনতার চৌর্যবৃত্তিই অনেক বেশি আপত্তিকর, সেখানে যে প্রতারণা চলে, সেখানে পুরুষরা যেভাবে নারীর উপরে ক্ষমতার চর্চা করে, সেগুলো দুনিয়া জুড়ে থাকে বলেই সমর্থন করতে পারি না। এমনকি, আমার বরং জুনিয়াজুড়ে থাকা পুরুষতান্ত্রিক মনোগামাস বিয়ে প্রথা নিয়েই ব্যাপক মাত্রায় আপত্তি আছে, পুরুষতান্ত্রিক বিয়ের মাধ্যমে যে মনোগামাস পরিবার গড়ে উঠে, সেগুলোকে আমি "প্রাইভেট প্রস্টিটিউশন", "দাস প্রথা", "সামন্তীয় ব্যবস্থা" বলে অভিহিত করি। হ্যাঁ, নারী স্বেচ্ছায় এরকম বিয়ে করলে, তার সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান রাখি বিধায়, সেই নারীকে "দাসী", "প্রস্টিটিউট" বলে গালমন্দ করি না, বস্তুত নারীকে যেহেতু ভিক্টিম গণ্য করি, তাদেরকে গালমন্দ করার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু, এই বিয়ে ও সংসার থেকে অন্যায় ও অসম সুবিধা ভোগ করা পুরুষকে আমি দোষারোপ করি (কেননা, তখন এটি আর ব্যক্তির ইচ্ছা বা স্বাধীনতা নয়, এখানে অন্যায় বা অপরাধ যুক্ত)। মোট কথা হচ্ছে, সংখ্যাগরিষ্ঠের চর্চা, সংস্কৃতি, অভ্যাস দিয়ে কখনই মোরালিটি নির্ধারিত হতে পারে না। 
 
আমি পরকিয়ার ব্যাপারে আপত্তি তুলি, সে তুলনায় ওপেন রিলেশনশিপকে অনেক বেশি সমর্থন করি। যেকোন বা অধিকাংশ দাম্পত্য সম্পর্কেই দেখা যায়, অনেক সময়ই একজনের যৌন আকাঙ্ক্ষায় বা আগ্রহে অন্য জনের মাঝে একই রকম আকাঙ্ক্ষা বা আগ্রহ তৈরি হয় না, সেভাবে সাড়া দিতে পারে না। প্রেম ও বিয়ের শুরুর দিকে দুজনের মাঝে যৌন আকাঙ্ক্ষার যে তীব্রতা থাকে, কয়েক বছর পরেই তা আর একইরকম থাকে না, যত বছর যায় ততই সেটা কমতেই থাকে। বিভিন্ন স্টাডিতে দেখা যায়, যারা পার্টনার পরিবর্তন করেছে (একাধিকবার বিচ্ছেদ ও নতুন সম্পর্কে জড়ানো), তাদের মাঝে অনেক বয়স পর্যন্ত যৌনভাবে সক্রিয় ও যৌনতাকে উপভোগ করার হার অনেক বেশি। অন্যদিকে সারাজীবন একই জুটির মাঝে একগামী সম্পর্কে যৌনতাটা একসময় অনেক গৌন হয়ে যায়। আমাদের মত পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একগামিতাটা থাকে কেবল নারীর, আর পুরুষরা নানাাভাবে বহুগামিতার চর্চায় লিপ্ত হয় বা হওয়ার চেস্টা করে বিধায় দেখা যায় - পুরুষ অনেক বয়স পর্যন্ত যৌনভাবে সক্রিয় থেকে যায়, কিন্তু নারী দ্রুতই যৌন-নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। অসংখ্য নারীই কেবল স্বামীর যৌন আবেদনে নির্জীব পুতুলের মত সাড়া দিয়ে যায়, সেটা তার জন্যে কোন রকম উপভোগের বিষয় তো থাকেই না, বরং এরকম যৌন উত্তেজনা বিহীন যৌনকর্ম কখনো কখনো খুব পেইনফুল হতে হতে, যাতে একটা যৌন-বিতৃষ্ণা তৈরি হয়ে যায়, যা তার যৌন-নিষ্ক্রিয়তাকেই আরো ত্বরান্বিত করতে পারে। নারীর এই যৌন নিস্ক্রিয়তাকেই সামাজিক নানা ট্যাবু, মূল্যবোধ আর মিথের নামে জেনারালাইজ করার চল রয়েছে। "সন্তান হলে" বা "মধ্যবয়সে" নারীর যৌনতা কমে যায়, যৌন আকাঙ্ক্ষা মরে যেতে থাকে, "মেনোপেজ হওয়ার পরে" নারীর যৌনতা নাই হয়ে যায় - এসবই হচ্ছে মিথ! যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া, নাই হয়ে যাওয়ার কারণ মোটেও সন্তান হওয়া, মধ্যবয়স হওয়া, মেনোপেজ- এসব নয়, বরং একগামিতা (এবং যৌনতার চর্চায় পুরুষের আধিপত্য তথা যৌনতার চর্চায় নারীকে গৌন বা প্যাসিভ করে রাখা, নারীর যৌনতুষ্টিকে গুরুত্ব না দেয়া)। অনেক সময়ই দেখা যায়, পরকিয়া বরং দম্পতির নিজেদের মাঝেও যৌন সক্রিয়তা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে! অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে প্রকৃতিগতভাবেই মানুষের মাঝে বহুগামিতার একটা ট্রেইট আছে, মানুষ আজকের আধুনিক ও সভ্য হওয়ার আগে লাখ লাখ বছর ধরে বহুগামিতার চর্চাই করে এসেছে। আজকের এই চাপিয়ে দেয়া একগামিতা মানুষের যৌনতাকে উপভোগ করার পথকে অবরুদ্ধ করেছে, যৌনতাকে সীমিত করেছে, যৌন আনন্দকে ধ্বংস করার মাধ্যমে অবদমিত করেছে, বিকৃতির জন্ম দিয়েছে! মানুষের প্রকৃতিগত স্বভাব, প্রবৃত্তি তথা স্বভাবজাত বৈশিষ্টকে জোর করে বা নানারকম সামাজিক মূল্যবোধ বা নৈতিকতার নামে নিয়ন্ত্রণ করা, নির্দিষ্ট ছাঁচে তৈরি করতে বাধ্য করা - এসবের ফল যে ভালো হয় না, তা আজকের বর্তমান পুরুষতান্ত্রিক একগামী সম্পর্কগুলোর দিকে তাকিয়েই আমরা বুঝতে পারি, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা যৌন বিকৃতিগুলোর দিকে তাকালে বুঝতে পারি। 
 
একগামী সম্পর্কে যে অধিকারবোধের ধারণা, পার্টিনারকে নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা, আমার পার্টনার "আমি" বাদে আর কোন পুরুষ বা নারীর সাথে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতে পারবে না, সেখান থেকে অন্য কারোর প্রতি যৌন আকর্ষণ বোধ করতে পারবে না, ঘনিষ্ঠভাবে মিশতে পারবে না, বন্ধুত্ব করতে পারবে না, এবং মেলামেশাই করতে পারবে না - এমন অধিকারবোধের ধারণা মানুষকে সীমাবদ্ধ করে, মানুষের গণ্ডি ও জগতকে খুব সীমিত করে দেয়। এভাবেই একগামী নিউক্লিয়াস পরিবারগুলোর মাঝে প্রচণ্ডরকম আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতার চর্চা শুরু হয়ে যায়। দুজনের প্রতি এমন চরম কেন্দ্রিকতা প্রথমে দুজনকে বাঁকি দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে, তারপরে একে-অপরের প্রতি প্রাথমিক সেই উত্তেজনা থিতিয়ে আসার পরে যখন দুজনের মাঝেও নানা রকম অতৃপ্তি, বিরক্তি, অসহিষ্ণুতা, অনাস্থা দেখা যায়, দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়, তখন দুটি মানুষই হয়ে যায় প্রচণ্ড নিঃসঙ্গ! পুরুষের তবু কর্মস্থলে যাওয়ার কারণেই, বাসার বাইরের একটা সামাজিক জীবন থাকে, গৃহে বন্দী গৃহিনী নারী বিচ্ছিন্ন, একাকী, নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করতে থাকেন। একটা পরকিয়া সম্পর্ক এমন নিঃসঙ্গ, বিচ্ছিন্ন, একাকী মানুষকে মুক্তি দিতে পারে, পরকিয়ার মাঝে যে প্রতারণা থাকে - অসততা থাকে, তার বিরোধিতা করি ঠিকই, এমন বিচ্ছিন্ন, নিঃসঙ্গ মানুষের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্যে নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়াকে আমি বেশ জরুরী বলে মনে করি।
 
সবমিলেই এরকম পুরুষতান্ত্রিক একগামী সম্পর্ক ও পরিবার এই সমাজ প্রগতিতে খুব কমই ভূমিকা রাখতে পারছে বলে আমি মনে করি। সেই জায়গা থেকে যখন বলি ভবিষ্যতে মানুষ যৌন স্বাধীনতা অর্জন করবে, বিয়ে প্রথাকে মানুষ ঘৃণাভরে ছুড়ে ফেলবে, মানুষের যৌনতা ও সম্পর্কের চর্চা হবে বহুমুখী, যৌনতার চর্চায় মানুষ ওপেন রিলেশনশিপকেই অধিক আঁকড়ে ধরবে, সেটা কেবল আমার ভবিষ্যদ্বানীই নয়, বরং সমাজ প্রগতির ধারায় এমন ভবিষ্যতকেই আমি প্রত্যাশা করি। যেভাবে আমি নারী-পুরুষের সমতা চাই, শ্রেণী বৈষম্যের অবসান চাই; তেমনি মানুষের যৌনতাকেও আমি মুক্ত করে দিতে চাই। এই চাওয়া, আর আমার বর্তমান চর্চার মাঝে বিস্তর ফারাক থাকতেই পারে। আমি শ্রেণীবিহীন সমাজ চাই, আবার আমি বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি করেছি, সাম্রাজ্যবাদী পাশ্চাত্য দুনিয়ায় বাস করি ও তাদের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করি। ঔপনিবেশিকতার চরম বিরোধী হওয়ার পরেও ঔপনিবেশিক যুগের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী দেশগুলোর একটায় বাস করি। নারী-পুরুষের সমতার পক্ষে কথা বলার পরেও, নিজ পরিবারে নিজের দিকে তাকালে ক্ষণে ক্ষণে টের পাই কত বড় পুরুষতান্ত্রিক পুরুষ আমার মাঝে বাস করে। একইভাবে, বিয়ে প্রথার বিরুদ্ধে থাকার পরেও ও নাস্তিক হয়েও, নিজে পরিবার গঠন করেছি কাজী ডেকে "ইসলাম" মতে বিয়ে করেই। একইভাবে লিভ টুগেদার, ওপেন রিলেশনশিপকে অনেক আধুনিক চর্চা হিসেবে বিবেচনা করলেও, নিজে একগামী সম্পর্কের চর্চা করি। ফলে, আমার মাঝে একটা-দুটা নয়, অসংখ্য স্ববিরোধিতা আছে বৈকি। কিন্তু, পুলক ঘটক যেভাবে আমার মাঝে স্ববিরোধিতা খুঁজে পেয়েছেন, মানে মুক্তমনারাও "ওপেন রিলেশনশিপ" এর ব্যাপারে আপত্তি করার পরেও আমি কেবল কাঠমোল্লা ও হেফাজতিদের মাঝেই আপত্তি খুঁজে পেয়েছি, - এমন কোন স্ববিরোধিতা আমার মাঝে নেই। "ওপেন রিলেশনশিপ" এর ব্যাপারে আমার কোন আপত্তি তো নেইই, বরং একে আমি সমাজ প্রগতির পথে খুব জরুরী ধাপ বলেই মনে করি। তবে, আমার আগের আলাপে একটা ভুল আমি করেছি। আমি কেবল কাঠমোল্লা ও হেফাজতিদের কথা বলেছিলাম, আসলে এরকম "ওপেন রিলেশনশিপ" এর ব্যাপারে আপত্তিটা কেবল তাদের নয়, কুপমণ্ডুক, সংস্কারগ্রস্ত, প্রতিক্রিয়াশীল মানুষের পক্ষেও এমনতর সম্পর্ক মেনে নেয়া সম্ভব নয়, এবং অনেক নাস্তিকও এমন কুপমণ্ডুক, প্রতিক্রিয়াশীল হতে পারে বৈকি!
 
ছয়
পুলক ঘটক তার এই পোস্টের শেষ করেছেন, তার পূর্বের লেখার একটি সংশোধনী দিয়ে। তিনি নাকি "খোঁজ দ্য সার্চ" করে জানতে পেরেছেন,
"পিনাকী যাই করুন না কেন, তার স্ত্রী এসব ওপেন/ সিক্রেট রিলেশনের মধ্যে নেই। তিনি (পিনাকীর স্ত্রী) একজন পরহেজগার ডাক্তার। নামাজ কখনো কাজা করেন না, রোজা যাতে মাকরূহ না হয়, সে ব্যাপারেও সতর্ক থাকেন। তিনি কেন ওপেন রিলেশন করবেন?"
এই যে অন্য ব্যক্তির স্ত্রী'র ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে "খোঁজ" নেয়া, আরেকজন নারীকে নিয়ে, তার ব্যক্তিগত জীবন, তার ধর্মাচরণ, তার সম্পর্ক চর্চার ওপেন/ সিক্রেট হওয়া না হওয়া, এসব সম্পর্কে নাক গলানো, খোঁজ নিয়ে পাবলিকলি "গসিপ" করা, এগুলো কেবল অরুচিকর ও নোংরা কাজই নয়, ঘোরতর অন্যায়ও। অবশ্য সাংবাদিকদের মাঝে এমন "এথিক্স" কেবল কাগজে-কলমেই থাকে, পাবলিক যেহেতু অন্যের ব্যক্তিগত ডোমেইনের কিচ্ছা-কাহিনী খুব খায়, বিখ্যাত - আলোচিত মানুষের "গোপনীয়তা"র একটা বাণিজ্যিক মূল্য আছে, এই বাণিজ্যমূল্যের কাছে সাংবাদিকদের সমস্ত "এথিক্স" মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। তাই পাপারাজ্জিরা "স্টার"দের ছবি গোপনে তুলেন, "গোপন" সম্পর্কের কথা খুঁজে বেড়ান এবং তার উপরে রঙ চাপিয়ে, মনের মাধুরি মিশিয়ে কাস্টমারকে খাওয়ান! সাংবাদিক পুলক ঘটকের আলাপেও তাই ঘুরে ফিরে এসেছে ক্লিনটন-মনিকা লিউনেস্কির কথা, এরশাদ-বিদিশার কথা, সন্যাসী - পোপ বা বড় হুজুরের গোপন বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্কের কথা! বলাই বাহুল্য, এসব বিষয়ে রসিয়ে সরিয়ে কিচ্ছাকাহিনীগুলো পাবলিকলি নিয়ে যাওয়ার কাজটা মিডিয়াগুলোই করে, এমন রসালো-উপাদেয় গসিপের জন্যেই গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ট্যাবলয়েড। ফলে, এসব চর্চার মধ্যে আজীবন কাটিয়ে দেয়া সাংবাদিকদের মধ্যে এমন চর্চাকে অন্যায় মনে না হওয়াটাই স্বাভাবিক! মজার ব্যাপার হচ্ছে, পুলক ঘটক নিজেই কিন্তু প্রশ্ন করেছেন,
"ক্লিনটন আর মনিকা সম্মতি নিয়েই সেক্স করেছিলেন, যদিও হিলারির সম্মতি নেননি। সমস্যা সেখানে হয়নি, হিলারি ক্ষমা করলে আমরা বলার কে?" 
হুবহু একই প্রশ্ন আমারও। ক্লিনটন ও মনিকা লিউনেস্কি বা অন্যরা যার সাথে ইচ্ছে সম্পর্ক করুন, সেখানে যদি কোন অন্যায় না ঘটে (মানে, নারী যদি প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ হন বা ড্রাঙ্কড-ড্রাগড না হন, এবং সজ্ঞানে ও কোন রকম চাপ ছাড়া সম্মতি প্রদান করেন), তাহলে তা নিয়ে দুনিয়ার মানুষের তো কোন রকম মাথাব্যথা থাকতে পারে না। হিলারির প্রতি প্রতারণার অভিযোগ বড়জোর আসতে পারে, সেটাও বস্তুত হিলারি'কেই করতে হবে। হিলারি'র যদি কোন মাথাব্যথা না থাকে, তাহলে কিভাবে সেটা নিয়ে দূর বাংলাদেশের সাংবাদিকদের এত আগ্রহ হয় যে, তারা দিনের পর দিন, পাতার পর পাতা আজেবাজে গল্প-কাহিনীতে ভরিয়ে ফেলতে পারে। এমনকি আমার মনে আছে, আমার এসএসসি কিংবা এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরে জাতীয় দৈনিকের এক সাংবাদিক সেই ব্যাপারে মন্তব্য করতে বলেছিলেন! [আমি অবশ্য তাকে চুপসে দিয়ে বলেছিলাম, তাদের সমাজে এমন সম্পর্ক (পারস্পরিক সম্মতিতে বহিঃবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক) অহরহই ঘটে এবং খুবই নৈমত্তিক একটা ব্যাপার। সেটা নিয়ে এই দূর বাংলাদেশে বসে আমাদের কথা বলার কি আছে? - আমার সেই মন্তব্য অবশ্য তারা ছাপেননি!]
 
যাই হোক, মূল আলাপে ফিরি। পুলক ঘটক তার সমাপনী বক্তব্য কেবল সংশোধনী দিয়ে এবং পিনাকীর স্ত্রী সম্পর্কে খোঁজ করে ও খোঁজে প্রাপ্ত তথ্যাদি পাবলিক করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি তার সাথে রঙ-ও চড়িয়েছেন। পিনাকী ও তার স্ত্রী'র বেডরুম কল্পনা করেছেন এবং পিনাকীর "পরহেজগার" মুসলিম স্ত্রী পিনাকীকে ঘুমের মধ্যে জবেহ করে (প্রথমে ভেবেছিলাম সুন্নতে খাৎনা করা কথা বলেছেন, পরে ভালোভাবে পড়ে দেখি শল্য চিকিৎসাটা "গলায়" করার কথা বলেছেন) ফেলতে পারেন বলে আশংকাও করেছেন। তিনি বলেছেন, 
"আমার বরং ভয় হচ্ছে - এরকম একজন সহীহ্ পরহেজগার বেহেশত পিয়াসী নারী শেষতক পিনাকীর গলায় শল্য চিকিৎসা সম্পন্ন করেন কিনা! পাসে ঘুমন্ত পিনাকীকে দেখে তার যদি কখনো মনে হয়, “শালা মালুর বাচ্চা মালু, তোর সঙ্গে সম্পর্ক করা যেনা। তোরে নিয়া বেহেশতে যাওয়ার উপায় নাই। বরং শফি হুজুরের ফতোয়া (ওয়াজিব) অনুযায়ী আল্লাহ আকবর বলে দায়িত্ব পালন করলে জান্নাতুল ফেরদৌসের রাস্তা সহজ হতে পারে!”    
একজন সুস্থ-স্বাভাবিক ও শুভ বোধ সম্পন্ন ব্যক্তি এমন সব কথা বলতে পারেন কি? পিনাকী ভট্টাচার্যের প্রতি ঘৃণা কোন পর্যায়ে গেলে তার সাথে তাত্ত্বিক ফাইট বাদ দিয়ে একজন লোক, এমন অসংলগ্ন ও কুৎসিত কথাবার্তা বলতে পারেন! পুলক ঘটক বুঝতেও পারলেন না যে, এখানে তিনি তার ঘৃণা কেবল পিনাকীর প্রতিই নিবিষ্ট রাখতে পারেন নি, বরং আরেকজন নারীর প্রতি, এবং যেকোন "পরহেজগার" ধার্মিক ব্যক্তির প্রতিও সেই ঘৃণা ছড়িয়ে দিয়েছেন! খুবই নিন্দনীয় ও অন্যায়মূলক কাজ!
 
 
সাত
পুলক ঘটক আমার প্রতি ও যারা পিনাকীর ব্যক্তিজীবন টেনে এমন পরচর্চার নিন্দা করেছেন, তাদের প্রতি একটা আহবান জানিয়ে তার পোস্টটি শেষ করেছেন। তিনি বলেছেন,
"আপনারা যারা গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর মত ‘করুণায়বতীর্ণ কলৌ’ তারা স্বকরুণায় পিনাকীর প্রাণ সংশয় মোচনের জন্য অবতীর্ণ হন"।
পিনাকীর স্ত্রীর হাতে তার প্রাণ সংশয়ের আশংকা আমার কোনদিনই হয়নি, দীর্ঘ দাম্পত্যজীবনে পিনাকীর "পরহেজগার বেহেশত পিয়াসী" স্ত্রী কখনই পিনাকীর গলায় শল্য চিকিৎসা সম্পন্নের প্রয়োজন দেখেননি, ফলে এভাবে প্রাণ সংশয়ের আশংকাও কেউ করেনি। তবে, পুলক ঘটক বস্তুত আশংকার নাম করে যেভাবে পিনাকীর স্ত্রীকে বেহেশতে যাওয়ার তরিকা বাতলে দিলেন, সেটা পিনাকীর প্রাণ সংশয়ে ভূমিকা রাখতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে কি? যদিও আমি এমন কোন সম্ভাবনা বা আশংকা দেখি না, তদুপরি পুলক ঘটকের এমন বক্তব্যের মাঝে পিনাকীর প্রাণ সংশয়ের সূক্ষ্ম ইচ্ছা বা প্রচেস্টা খুঁজে পাই। সে জায়গা থেকে বলছি, হ্যাঁ পিনাকীকে যতই শত্রুবৎ বিবেচনা করি, তারও প্রাণ সংশয়ের যেকোন প্রচেষ্টা মোচনের জন্যে অবতীর্ণ আমি হই। আমার মানবিকতা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা- আমাকে এই শিক্ষাই দেয়। তার জন্যে কোন গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু বা কোন ঋষি-মহামানব বা নবী-রাসুলকে অনুসরণের দরকার আমি দেখি না। গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু বা বিভিন্ন নবী-রাসুলকে বা তাদের বানীকে অনুসরণ করি না বলেই, আমি যেকোন ধর্মের- বর্ণের- মত ও পথের, এমনকি আমার চিন্তা-রুচি-আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত ব্যক্তিরও প্রাণ সংশয় মোচনের জন্যে অবতীর্ণ হওয়াটা আমি কর্তব্যজ্ঞানই করি। এবং, আশা করি, পুলক ঘটক পিনাকীর তথা একজন চরম শত্রুরও প্রাণ সংশয়ের আশা করবেন না বা প্রাণ সংশয়ে পরোক্ষ ভূমিকা রাখবেন না, বরং তিনিও পিনাকীর প্রাণ সংশয় মোচনের জনেই অবতীর্ণ হবেন।
 
 
পরিশেষে, পুলক ঘটকের বোধোদয় ঘটুক, শুভবুদ্ধির উদয় হোক - এই প্রত্যাশাই করে আলোচনা শেষ করছি!

[১। পুলক ঘটকে পোস্টের এবং সেখানকার কমেন্টের তর্ক-বিতর্কের প্রতিক্রিয়ায় ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ এ লেখা পোস্টের পুনর্লিখিত, পরিবর্তিত, পরিবর্ধিত রূপ। ঐ পোস্টে নাদিয়ার "নারীবাদী" গালিগালাজ সম্পর্কিত একটা অংশ ছিল, তা এখানে বাদ দিয়ে কেবল পিনাকী ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ রেখেছি। ঐ পোস্টের মূল আলোচনার সাথে কমেন্টের তর্ক-বিতর্কও এখানে যুক্ত করেছি। এবং আমার পোস্টের জবাবে পুলক ঘটক যেই পোস্ট লিখেছিলেন, সেটিরও জবাব সে সময়ে দেয়া হয়নি, সেই জবাব বর্তমান এই পোস্টে লিখেছি। নতুন করে এই লেখাটি তৈরি করেছি ১২-১৩ জুন, ২০২৪ তারিখে; তবে এখানে এটি পোস্ট করেছি, সেই পুরাতন মূল পোস্টের তারিখেই (২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯)।
 
২। পুলক ঘটকের ১ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে জবাব পোস্টের মাধ্যমে জানতে পেরেছি, পুলক ঘটক ও পিনাকী ভট্টাচার্যের মাঝে এই লেখাগুলোর আগেও বেশ তর্ক-বিতর্ক হয়েছে এবং স্বভাব অনুযায়ী পিনাকী গালাগালির ফোয়ারা ছুটিয়েছেন। সেই গালাগালিতে পিনাকী পুলক ঘটকের স্ত্রীকে টেনে এনে "ধর্ষণের ইচ্ছা"ও নাকি পোষণ করেছেন (পিনাকীর মত মানসিকভাবে বিকৃত একজনের পক্ষে এটা খুব নৈমত্তিক এক কাজই বটে)। যেই সময়ে (পুলক ঘটকের ওপেন রিলেশপনশিপ নিয়ে লেখা পোস্টের সময়টায়) আমি পুলক ঘটক ও অন্যদের সাথে এই তর্ক করছিলাম, তখন এই ঘটনা জানতাম না। আমি যদি পুলকের পিনাকীকে নিয়ে এই সমস্ত আলোচনাকে কেবল পাল্টা গালি হিসেবে দেখতাম, তাহলে এত আলোচনা হয়তো করতাম না, কেননা আমি মনে করি - গালাগালির সময়ে মানুষ অনেক কিছুই বলে যা মিন করে না, ফলে গালির ভাষা নিয়ে এত বিচার বিশ্লেষণ করার কিছু নেই। পিনাকী যেহেতু শুরুতে পুলকের স্ত্রীকে জড়িয়ে বাজে গালি দিয়েছেন, সেহেতু পুলকের পাল্টা গালিতে পিনাকীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও তার স্ত্রীকে টেনে আনার পেছনে পিনাকীর ভূমিকাও আছে। গালাগালিতে এই যে একে অপরকে বাদ দিয়ে বা ছাপিয়ে আরেক নারীকে টেনে আনা (কখনও মাকে, কখনও বোনকে, কখনো স্ত্রীকে), একে আমি প্রচণ্ড পুরুষতান্ত্রিক ও মিসোজিনিস্টিক আচরণ বলে মনে করি, গালাগালির ক্ষেত্রে সেই দোষে তাদের দুজনই দুষ্ট, তবে পিনাকী এটি শুরু করেছে বিধায় তার দোষ অধিক।
 
৩। তদুপরি, এই পোস্টটায় পিনাকীর "ওপেন রিলেশনপিশ" ও "হিন্দু-মুসলিম বিয়ে" প্রসঙ্গেই সমস্ত আলোচনা সীমাবদ্ধ রেখেছি, যেহেতু সেগুলোকে পুলক ঘটকের নিছক গালি হিসেবে বিবেচনা করিনি। কেননা, পুলক ঘটক এবং আরো অসংখ্য নাস্তিক, সেক্যুলার, প্রগতিশীল ফেসবুকার, ব্লগার, লেখক এই তর্ক বিতর্কে লিপ্ত হয়েছেন, তারা বিভিন্ন লেভেলে যে যুক্তিগুলো করেছেন, সেখানে পিনাকীর গালির জবাবে গালি হিসেবে বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকেনি। পুলক ঘটক ও তাদের সেই চিন্তাগুলোকেই আমি আসলে এখানে এই পোস্টে কাউন্টার করার চেস্টা করেছি।]

বৃহস্পতিবার, ১৬ মার্চ, ২০১৭

আত্মহত্যা !!!

 এক

আত্মহত্যা করার ইচ্ছে বিভিন্ন সময়ে অনেকেরই হয়। আমার চারপাশের পরিচিত ও কাছের অনেক মানুষের কাছেই শুনেছি- বিভিন্ন সময়ে তাদের আত্মহত্যা করার ইচ্ছে হয়েছিল। সাহিত্যেও এই প্রবণতা প্রচুর দেখেছি। গোটা দুনিয়া জুড়েই প্রতিবছর প্রচুর মানুষ আত্মহত্যা করে। ভারতের একদম হতদরিদ্র চাষী যেমন আত্মহত্যা করে, তেমনি জাপান সহ উন্নত বিশ্বেরও প্রচুর মানুষ প্রতিবছর আত্মহত্যা করে। অবশ্য আত্মহত্যা করার ইচ্ছে হলেই যে আত্মহত্যা করে ফেলে মানুষ, তা নয়। আত্মহত্যা করা বাস্তবে খুবই কঠিন এক কাজ। নাহলে, বর্তমানে যত আত্মহত্যা আমরা দেখি- তার বহুগুন বেশি মানুষ আত্মহত্যা করতো। নানাবিধ কারণেই মানুষ আত্মহত্যা করে। প্রচণ্ড ধার্মিক ব্যক্তি যেমন আত্মহত্যা করে, পাঁড় নাস্তিকও আত্মহত্যা করে। তবে, নাস্তিকের চাইতে একজন ধার্মিকের জন্যে আত্মহত্যা করা কঠিন, কেননা তাকে জান্নাতের লোভ বা দোজখের ভয়কে অতিক্রম করতে হয়, যেরকম কোন কিছু নাস্তিকের হয় না (আজকেও এক আত্মহত্যা করা মেয়ের শেষ মেসেজের একটা লাইন পড়লামঃ “জানি জান্নাত পাবো না”!)। কেউ আত্মহত্যা করলে- সাধারণত তার জন্যে আমার খুব কষ্টবোধ হয় না, বরং মনে হয়- যে জীবন যে বহন করতে পারছিলো না, সেখান থেকে একরকম মুক্তিই সে পেল! হ্যাঁ, কষ্টবোধ যতখানি হয়- সেটা তার কাছের মানুষের জন্যে, যদি কাছের মানুষ থেকে থাকে- এরকম মৃত্যু কাছের মানুষদের পক্ষে মেনে নেয়া আসলেই খুব কঠিন।

https://www.kalerkantho.com/_next/image?url=https%3A%2F%2Fcdn.kalerkantho.com%2Fpublic%2Fnews_images%2F2024%2F01%2F27%2F1706338269-4ab9eeb013d762b85d594a0e858dd0af.jpg&w=1920&q=100
(প্রতীকি ছবিটি কালের কন্ঠ থেকে সংগৃহীত)

 

দুই
আত্মহত্যার ইচ্ছা যেমন বাস্তব, তেমনি তার চাইতেও বাস্তব হচ্ছে বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছা। সে কারণেই হয়তো আত্মহত্যা করাটা এত কঠিন। আত্মহত্যা করার পূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার পরেও মানুষ তাই আত্মহত্যা করতে পারে না। তার সমস্ত শরীর শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত বেঁচে থাকার চেস্টা করে। সেকারণে সম্ভবত নিজের হাত দিয়ে নিজের নাক মুখ চেপে শ্বাস বন্ধ করে আত্মহত্যা করা সম্ভব হয় না। যে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে- সেও শেষ মুহুর্তে পানিতে দাপাদাপি করে বেঁচে থাকার চেস্টায়। বিষ খেয়ে (হারপিক বা ঘুমের ওষুধ) আত্মহত্যার চেস্টা করা মানুষকে আমি দেখেছি- মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসার আপ্রাণ ও তীব্র সংগ্রাম করতে। সে কারণে বলা হয়- আত্মহত্যার প্রচেস্টা সফল হয় নিজেকে হত্যার আকস্মিক ও দ্রুত প্রচেস্টায়। নিজেকে মারার অসংখ্য উপাদান ও উপায় আমাদের চারপাশেই আছে, তারপরেও যারা বসে বসে সুন্দরতম উপায়ে আত্মহত্যার উপায় খুঁজে এবং নানাজনকে আত্মহত্যার ভয় দেখায়, বুঝতে হবে- তার পক্ষে আত্মহত্যা করা বেশ কঠিন, কেননা সে মরতে আসলে ভয় পায়।

 

তিন
মানুষ কেন আত্মহত্যা করে? বেশ কঠিন প্রশ্ন। এবং এর জবাব নিশ্চয়ই সকল মানুষের জন্যে একরকম নয়। কেননা- মানুষ খুব বিচিত্র এক প্রাণী। দুনিয়ার ৭০০ কোটি মানুষ আসলে ৭০০ কোটি রকম। তারপরেও আত্মহত্যার প্রবণতার জন্যে মোটাদাগে যে কারণগুলির কথা বলা হয় সেগুলো হচ্ছে- হতাশা, বিষন্নতা, একাকিত্ব, জীবনের উদ্দেশ্যহীনতা, চরম ব্যর্থতা, নিজের প্রতি চরম আস্থাহীনতা তথা ভয়ানক হীনমন্যতা ইত্যাদি। এগুলো একটার সাথে আরেকটি সম্পর্কিত যেমন হতে পারে, তেমনি নানা কারণেই এগুলো একজন মানুষের মাঝে আসতে পারে।

 

চার
আমাদের এই অঞ্চলে প্রেম, প্রেমে ব্যর্থতা, প্রতারণা, ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে অবহেলা- এইসব কারণে আত্মহত্যার প্রবণতা একটু আশঙ্কাজনকভাবেই বেশি। কেন জানি- এইসব কারণে আত্মহত্যা যারা করে- তাদের প্রতি আমার করুনাই হয়। যাকে আমি প্রচণ্ড ভালোবাসি- সে আমাকে নাও ভালোবাসতে পারে- যত খারাপ লাগুক বা কষ্টই হোক- এটা মেনে নিতে পারাটা খুব জরুরি। কিংবা একদিন যে আমাকে ভালোবেসেছে- তার সেই ভালোবাসা সারাটা জীবন একইরকম নাই থাকতে পারে- বুঝতে হবে প্রেম ভালোবাসা দ্বিপাক্ষিক একটা ব্যাপার। যৌনতাও তাই। এবং পারস্পরিক প্রেম ভালোবাসা কিংবা যৌন আকাঙ্খা আজীবন একইরকম না থাকাটাও একটা বাস্তবতা। কেউ আমাকে আজ তীব্র ভালোবাসে বলে, কাল আমার প্রতি একই রকম ভালোবাসা না থাকলে- আমার দুনিয়া যদি অন্ধকার হয়ে যায়, তাহলে আমার চাইতে বেকুব কেউ আছে বলে মনে হয় না। আমার ভালোবাসার মানুষ যদি আমার সাথে প্রতারণা করে, আমার বিশ্বাস-আস্থা নষ্ট করে- তাহলেও যত কষ্ট হোক- মেনে নিতে হবে এই কারণে যে, এইসবই মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা। বরং, এইসব প্রতারণার পরেও সেই ব্যক্তিকে যদি আমি একইরকম ভালোবেসে যাই এবং বসে বসে কষ্ট পাই- তার চাইতে চরম বেকুবি কিছু হতে পারে না। আমাদের সমাজে এইসব ছিলি ব্যাপারে মানুষ অহেতুক কষ্ট পায় এবং আত্মহত্যা প্রবণ হয়- তার কারণ সম্ভবত প্রেম- ভালোবাসা এবং যৌনতা খুব দুষ্প্রাপ্য বস্তু। ছেলেমেয়েদের স্বাভাবিক মেলামেশা, একসাথে মিলেমিশে- খেলেদুলে- ভালোবেসে- প্রেম করে- বেড়ে ওঠার সুযোগ কম। তার উপর আছে- যৌনতা, বিয়ে, পরিবার এইসব নিয়ে নানারকম ট্যাবু। তারও উপর আবার আছে- সামাজিক- পারিবারিক নানা বাঁধা। নারীর উপর তার সাথে যুক্ত হয়েছে- সতীত্ব নামক আরেক ট্যাবু এবং সামাজিক ভয়।

অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি- যে সমাজে ছেলেমেয়েরা পিওবার্টিতে আসার আগেই দুই তিনবার প্রেমে পড়েছে এবং বিচ্ছেদে অভ্যস্থ হয়েছে, পিওবার্টির পরের প্রেম-ভালোবাসার ব্যর্থতা কিংবা সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া মেনে নিতে তাদের সমস্যা কম হওয়ার কথা- এমনকি শৈশবে ছেলেমেয়েদের একসাথে বেড়ে উঠতে দিলে- খেলার সময়ে যে বন্ধুত্ব হয়- যে ঝগড়া হয়- আড়ি নেয় আবার আড়ি ভাঙে, একজনের সাথে আড়ি নেয়ার পরে আরেকজনের সাথে বন্ধুত্ব হয়- তাদের মধ্যেও বড়কালের প্রেম-বিচ্ছেদ-বিরহ এইসবে মানসিক বৈকল্য কম আসে। যৌনতাকে স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক প্রবণতা হিসেবে দেখতে শিখালে- এই কেন্দ্রিক ফ্যান্টাসি অনেক কমে আসবে বৈকি। কারো সাথে একবার যৌনতার সম্পর্ক হয়ে গেলে- দুনিয়ার আর সব পুরুষের কাছে অসতী, আর কেউ বিয়ে করতে আসবে না- এই ধারণা থেকে বের হতে না পারলে- কিভাবে ঐ নারীর পক্ষে তার সাথে যৌন সম্পর্ক করা ব্যক্তির সাথে সাম্ভাব্য সম্পর্কচ্ছেদ মেনে নেয়া সম্ভব হবে?

 

পাঁচ
কিছু আত্মহত্যাকে আমি হত্যা হিসেবে গণ্য করি। সেই মানুষগুলোর জন্যে প্রচণ্ড কষ্ট অনুভব করি এবং যারা এই আত্মহত্যা তথা হত্যার জন্যে দায়ী- সেই হত্যাকারীর প্রতি ক্ষুব্ধ হই। যেমন- স্বামীর সীমাহীন লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, অত্যাচার, নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে যে নারী আত্মহত্যা করে কিংবা পাড়ার মাস্তানদের নির্যাতন- নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে যে আত্মহত্যা করা সীমা, ঋতু, মিনুরা আসলে হত্যার শিকার। একইভাবে গ্রামীণ ব্যাংক- ব্রাক সহ নানা প্রতিষ্ঠানের ক্ষুদ্র ঋণের জালে আটকা পড়ে যে সর্বস্বান্ত চাষী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয় কিংবা শেয়ার বাজারে সর্বস্বান্ত হয়ে যে ব্যবসায়ী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়- তাদের হত্যার জন্যে দায়ী যারা তাদের প্রতি এবং এই সমাজের প্রতি বিক্ষুব্ধ হই। ভারতে গত ২০ বছরে যে ৩ লাখ হতদরিদ্র চাষী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে- কিংবা দুনিয়াজুড়ে ক্ষূধা-দারিদ্রের কারণে যেসব বাবা-মা সন্তান সমেত আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয় (সন্তানকে বাস্তবে হত্যা করে)- তাদের কথা ভাবলে সুস্থ হয়ে বসে থাকতে পারি না, নিজের মাঝে অপরাধবোধ তৈরি হয় এবং এরকম অসম, অসুন্দর দুনিয়ার প্রতি তথা জীবনের প্রতি একরকম বিতৃষ্ণা তৈরি হয়।

 

ছয়
জীবনের প্রতি বিভিন্ন সময়েই আমার বিতৃষ্ণা তৈরি হয়েছে, এখনো হয়। সামাজিক নানা ন্যায়-নীতিবোধ, দায়িত্ব ইত্যাদি যেমন একরকম আমাকে চালনা করে, তেমনি একেক সময়ে এসব খুব ক্লান্ত করে। তখন এসব কোন কিছুর মানে খুঁজে পাই না। দৈনন্দিন রুটিনের প্রতিটা কাজ, বিশেষ বা সাধারণ- সব কিছুকেই অহেতুক, অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। বেঁচে থাকাটাও মনে হয় একটা বোঝার মত। অন্যদের এরকম হয় কি না জানি না, আমার হয়। প্রতিটি মানুষই আসলে একা। যেহেতু সে আলাদা। আবার প্রতিটি মানুষই সামাজিক, ফলে অবশ্যই সে কোন না কোন সম্পর্কে যুক্ত। কোন কোন সম্পর্ক এমনই তীব্র- যার জন্যে সে বেঁচে থাকাকে কর্তব্যজ্ঞান করে। তারপরেও সে প্রচণ্ড একা হতে পারে। অন্যের জন্যে বেঁচে থাকার যে কর্তব্যজ্ঞান, সেটাও তাকে মাঝেমধ্যে ক্লান্ত করতে পারে।

আমার অনেকবারই আত্মহত্যা করার ইচ্ছে হয়েছে। ‘আত্মহত্যা’ বিষয়টি নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলেই- ইচ্ছেটা ফিরে আসে। আত্মহত্যাকে তখন খুব সুন্দর ও সাহসী একটা ব্যাপার মনে হয়। সাহসী ব্যাপার মনে হয়, কেননা আমার ধারণা আমি আত্মহত্যা করতে পারি না- কেননা আমার সেই পরিমাণ সাহস নেই। ফলে, যারা আত্মহত্যায় সফল হন- তাদের প্রতি একরকম শ্রদ্ধাবোধ কাজ করে। আমি যেটা পারি না, সেটা তারা পারে; আমার মত তারা ভীতু নয়। কেউ কেউ বলতে পারে, জীবনের প্রতি আমি যতখানি বীতশ্রদ্ধ- তার চাইতেও বাঁচার প্রতি আমার আকুতি বেশি, সে কারণেই আমি আত্মহত্যা করার মত সাহস অর্জন করতে পারিনি। হয়তো বা! হতে পারে। জীবনের প্রতি আমার বিতৃষ্ণা আছে, নানা সময়ে নানা বিষয়ে হতাশা তৈরি হয়, নিজেকে নিয়েও আমার প্রচণ্ড হতাশা আছে, নিজের সারাজীবনের পাহাড়সম ব্যর্থতা শুধু নয়, সারাজীবনের যাবতীয় ভুল- অপরাধ- অন্যায় আমাকে ভোগায়, একই সাথে সফলতার আকাঙ্ক্ষা আর নীতি-নৈতিকতার বোঝা আমাকে প্রচণ্ড ক্লান্ত করে- সমস্ত বৈপরীত্য আর টানাপোড়েন আমার কাছে মাঝেমধ্যে অসহ্য লাগে। তারপরেও স্বীকার করি, জীবনের প্রতি একেবারেই বীতশ্রদ্ধ বলতে যা বুঝায়, সে অবস্থা আমার না। সারাক্ষণ বিষন্ন হয়ে বসে থাকি না, কিংবা বিষন্নতা এসে আমার অন্যসব আনন্দে ভাগ বসাতে পারে না। একটা ভালো বই, একটা ভালো সিনেমা, একটা বিতর্ক, আলোচনা, প্রিয় মানুষদের সাথে সময় কাটানো, কিংবা একটিভিজম- এসবে তীব্র আনন্দের সাথে মগ্ন হতে পারি। ফলে, বলা যায়- আমার বিষন্নতা সাময়িক এবং নিঃসঙ্গ ও অবসর সময়ের অনুষঙ্গ।

আত্মহত্যায় সফল অনেকের মত জীবনের প্রতি সম্পূর্ণ বীতশ্রদ্ধ না হলেও, বলতে পারি বেঁচে থাকার প্রতি তীব্র আকুতি বা আকর্ষণও আমি বোধ করি না। বেঁচে থাকার কোন অর্থ, মানে, উদ্দেশ্য খুঁজে পাই না। মাঝে মধ্যে বেঁচে থাকাটা প্রচণ্ড ক্লান্তিকর ও অনর্থক পণ্ডশ্রম মনে হয়। সেজায়গা থেকে আত্মহত্যার ইচ্ছেও হয় মাঝে মধ্যে, কিন্তু আত্মহত্যা করতে পারি না- তার প্রধান কারণ মৃত্যুর ভয়। আমার অবর্তমানে প্রিয় মানুষদের সীমাহীন কষ্টের কথা অনুভব করতে পারি, যখন ভাবি আমার প্রিয় মানুষ কেউ যদি একইভাবে আত্মহত্যা করে, তখন আমি কেমন অনুভব করবো! এই চিন্তাও আমাকে আত্মহত্যা করা থেকে বিরত রাখে। তবে, মাঝেমধ্যে মনে হয়- মৃত্যুভয়ের হাত থেকে বাঁচার জন্যেই হয়তো এমন যুক্তি খুঁজে নেই। মাঝেমধ্যে মনে হয়- আত্মহত্যা করারও বা মানে কি, অর্থ কি, কি এর প্রয়োজনীয়তা? আত্মহত্যার উদ্যোগও কম ক্লান্তিকর মনে হয় না তখন!

 

সাত
আস্তিকদের সাথে তর্কের সময়ে অনেকেই বলতো ঈশ্বর না থাকলে, পরকাল না থাকলে, আল্লাহ’র ধারণা না থাকলে- বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যই তো নাই হয়ে যায়! আমি কথাটার সাথে একমত; কিন্তু বেঁচে থাকার জন্যে অতিপ্রাকৃত ও মিথ্যা উদ্দেশ্য রাখার কোন প্রয়োজনীয়তাও দেখি না। একইভাবে বিবর্তনের নিয়ম মোতাবেক প্রাকৃতিক সিলেকশন তথা প্রজাতি টিকে রাখার উদ্দেশ্যে বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয়তা বা দায় আমি ঠিক অনুভব করি না। দুনিয়ার অসংখ্য প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে, আরো অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে, প্রকৃতি তা আপন নিয়মে নির্বাচন করবে- সেটা নিয়ে আমার কোন হেডেক নেই, কেননা মানুষ নামক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেলেও আসলে কিছু যায় আসে না, কেননা মানুষের উদ্ভব ও মানুষের মানুষ হয়ে ওঠাটাই একটি আকস্মিক ঘটনা বা দুর্ঘটনা। মানুষের উদ্ভব না ঘটলে, মানব সমাজ না তৈরি হলে, কিংবা আমার জন্ম না হলে- কোন কিছুরই কিছু যায় আসতো না। এই কোন কিছু যায় না আসার পরেও, এই চরমতম উদ্দেশ্যহীনতার পরেও বিবর্তনের নিয়মে মানুষের উদ্ভব হয়েছে, বিবর্তনের পথ ধরেই মানুষের মাঝে বেঁচে থাকার তীব্র চেস্টা অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য হিসেবে বাসা বেঁধেছে এবং আমার জন্ম হয়েছে, আমার মাঝে হয়তো সেই বৈশিষ্ট যুক্ত হয়েছে। আত্মহত্যার প্রবণতাও বিবর্তনের ফল, কিন্তু মানুষ যে যুগ যুগ বেঁচে আছে- নিজের মত করে উদ্দেশ্যের কথা ভেবে কিংবা কোন উদ্দেশ্য ছাড়াই, কিংবা বলতে গেলে বেঁচের থাকার উদ্দেশ্যেই বেঁচে থাকছে- সেটাও বিবর্তনের পথ ধরে এবং আমারও মাঝে যে মৃত্যু ভয় সেটাও হয়তো বিবর্তনের ফল।

 

আট
আর সেকারণেই হয়তো- যে আমি আত্মহত্যার সুখ কল্পনায় ভাসি, সেই আমিই আবার ধর্মান্ধদের চাপাতির কোপে বেঘোরে প্রাণ দিতে অস্বীকার করি। পালিয়ে বেড়াই, এবং সময় সুযোগে তীব্র ক্ষোভে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াই। উদ্দেশ্যহীন দুনিয়ায় আবার এই ধর্মান্ধ মানুষগুলোকে যখন নগন্য কীটের মত মনে হয়, সব ক্ষোভ হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। আর যখন বুঝতে পারি- মানুষ আসলে কীটের চাইতেও নগণ্য, তখন অসহায় লাগে। মানুষ তার হাতে তৈরি সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি, ধর্ম, নীতি নৈতিকতা, জ্ঞান, বিজ্ঞানের দাস হয়ে উন্নত হচ্ছে, অবনত হচ্ছে, ভালোবাসছে, ঘৃণা করছে, একে অপরকে বাঁচাচ্ছে, মারছে- এ সমস্তকেই অনর্থক, অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। কীটের জীবন, প্রাণীর জীবন, গাছের জীবনকে বড় আকর্ষণীয় মনে হয়, সভ্যতার কোন দায় নেই, নেই কোন বোঝা! সেই আদিম, বন্য, অসভ্য মানুষের জীবনকে আকর্ষণীয় মনে হয়, সভ্য হতে গিয়ে মানুষ কত কি যে হারিয়েছে, মানুষ কি তা জানে?

 

নয়
বেঁচে থাকা যেমন অর্থহীন, মৃত্যুও তাই। অথচ, আমরা কেবল মৃত্যুকে জয় করতে চাই। কেননা আমরা মৃত্যুকে ভয় পাই। কিন্তু কেবল মৃত্যু ভয়ই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে না, সে বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে, উদ্দেশ্য খুঁজে। অলৌকিক, অপ্রাকৃত, মিথ্যা উদ্দেশ্য ও অর্থ যেমন অনেকে খুঁজে, তেমনি অনেকে – এমনকি চরম ধার্মিক ব্যক্তিও- কেবল এইসব অপ্রাকৃত মিথ্যার মাঝে জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে সন্তুষ্ট থাকতে পারে না। তারা প্রাত্যহিক ছোট ছোট নানা কিছুর মাঝে জীবনের অর্থ খুঁজে বেড়ায়। বেঁচে থাকা অনেকটা সংগ্রামের মত, অনেকের কাছে এই সংগ্রামে প্রতিনিয়ত জয়ী হওয়াটাই জীবনের উদ্দেশ্য, অনেকের কাছে একটা সম্পর্কই হয়তো তার জীবনের উদ্দেশ্য, অনেকের কাছে ছোট ছোট সুখ- আনন্দ- অনুভূতি- হাসি -কান্না, এইসবও জীবনের উদ্দেশ্য।

 

দশ
আমার কাছে এগুলো জীবনের বা বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য বা অর্থ নয়। এরকম ছোটখাট টুকরো টুকরো বিষয়গুলো আমার সামনে চলার অনুপ্রেরণা। আমি হাঁসতে ভালোবাসি, কাঁদতে ভালোবাসি, প্রচণ্ড আনন্দে কাঁদার মাঝে আনন্দ আছে, প্রচণ্ড দুঃখে পাগলের মত হাসার মাঝে একরকম মাদকতা আছে। আমি শান্তির বানীকে ঘৃণা করি, আমি ধ্বংসকে ভালোবাসি। কেননা আমি জানি যাবতীয় যুদ্ধের মূলে আছে শান্তি নামক প্রতারণা, ঠিক শান্তির ধর্মের মতই। তাই আমি ধ্বংস কামনা করি- সমাজ সভ্যতার, ধর্মের, অসাম্যের, ভেদাভেদের। সে কারণে আমি মৃত্যুকেও ভালোবাসি- কেননা মৃত্যুর সাথে সাথে সমাজ- সভ্যতা- ধর্ম- অসাম্য- ভেদাভেদ সবেরই সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু কাঁদার জন্যে, হাঁসার জন্যে, ঘৃণার জন্যে, ভালোবাসার জন্যে, ধ্বংস করার জন্যে, সৃষ্টি করার জন্যে, এমনকি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার জন্যেও অন্তত বেঁচে থাকতে হয় বৈকি। তাই আমি বেঁচে থাকতেও ভালোবাসি। এবং এ কারণেই হয়তো- বেঁচে থাকি …

আত্মহত্যার পরিসংখ্যানঃ
১। http://www.suicide.org/international-suicide-statistics.html

২। "এক বছরে ৫১৩ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা, নারীর সংখ্যা বেশি" - দৈনিক কালের কন্ঠ, ২৭ জানুয়ারি ২০২৪, https://www.kalerkantho.com/online/national/2024/01/27/1358413


[প্রথম প্রকাশঃ মুক্তমনা ব্লগ, ১৭ মার্চ, ২০১৭]

শুক্রবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০১৭

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গে

[প্রায় ৯ বছর আগে যেভাবে জামাতী ও হিজবুত তাহরীর এর পেইড ব্লগাররা (যেমনঃ ত্রিভুজ, আশরাফ রহমান প্রমুখ) সামহোয়াইনব্লগে "হিন্দু কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের" বিরুদ্ধে নানারকম বিভ্রান্তি, মিথ্যা ইতিহাস, অপপ্রচার চালিয়ে আমাদের জাতীয় সঙ্গীত পাল্টানোর দাবি তুলতো, এখন এই ফেসবুক ও ওয়াজের যুগে - মাঝেমধ্যেই সেই ত্রিভুজীয় ভাষাতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে নানান হুজুর ওয়াজ গরম করেন, ফেসবুকেও দুদিন পর পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে নানান অপপ্রচার চালিয়ে ঘৃণা উৎপাদন করা হয়। সে কারণেই, ৯ বছর আগে লেখা পোস্টটিকেই নতুন করে কিছুটা পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত রূপে ব্লগে নিয়ে আসলাম।]

তাদের মূল বক্তব্য কী?
“আমাদের জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটির যৌক্তিকতা কতখানি? যেখানে, এর রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশ চেতনার বিরোধী ছিলেন, বা বাংলাদেশ তথা পূর্ববঙ্গের উন্নতির বিরুদ্ধপক্ষ মানুষ ছিলেন। কেননা-
১। তিনি বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ভূমিকা নিয়েছিলেন।
২। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে কলকাতায় আয়োজিত সমাবেশের সভাপতিত্ব করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৩। আমাদের স্বাধীনতা হরণকারী ব্রিটিশদের তাবেদার ছিলেন। কেননা, তিনি জনগণমন ভাগ্যবিধাতা গানটি রচনা করেছিলেন সাদা চামড়ার স্তুতির উদ্দেশ্যে।
 

উপরের তিনটি ঘটনাকে একটু বিশ্লেষণ করা যাক!
 

 ১। বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ভূমিকাঃ  

বঙ্গভঙ্গের ঘটনার সাথে বাংলাদেশ চেতনার কোন সম্পর্কই নেই, যেমনটি নেই বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলনের সাথে বাংলাদেশ চেতনার বিরোধিতার। এটা ঠিক যে, পূর্ববঙ্গের মুসলিম উঠতি বুর্জোয়া শ্রেণীর তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বুর্জোয়া শ্রেণী বিভিন্ন দিক থেকে এগিয়ে ছিল, কেননা- তারা মুসলিমদের আগে থেকেই ইংরেজী শিক্ষার দিকে ঝুকেছিল এবং বণিকী পেশাতেও তারা অগ্রজ ছিল। ফলে, ইংরেজরা যখন ডিভাইড এণ্ড রুল এর নীতিতে বঙ্গভঙ্গ করলো- ঐ হিন্দু বুর্জোয়া অংশ স্বভাবতই তার বিরোধীতা করে। এবং মুসলিম অংশটিকে গোষ্ঠী স্বার্থেই ইংরেজরা পক্ষে পায়। তবে, এই অংশদুটির বাইরে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে দুই বঙ্গের অনেক উদারমনা ব্যক্তিই এই বঙ্গভঙ্গের বিরোধীতা করেছিল এই জায়গা থেকে যে, প্রথমত ইংরেজরা প্রথমবারের মত সাফল্যের সাথে হিন্দু-মুসলিমে বিভেদ টানতে সক্ষম হয়, যা স্পষ্ট হয় পরবর্তি দাঙ্গায়, [যার চুড়ান্ত ফলাফল গিয়ে দাঁড়ায় দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ধর্মকেন্দ্রিক পাকিস্তান নামক হাস্যকর রাষ্ট্রটির উদ্ভব]; এবং দ্বিতীয়ত- অবিভক্ত বাংলার স্বপ্নচারী ও অভ্যস্ত মানসিকতায় ইংরেজ কর্তৃক নির্মম আঘাতের কষ্ট।
 

এটা পরিস্কার যে,

– এই বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনাকারী ইংরেজরা,
– মুসলিম লীগের উৎত্তির পেছনেও তাদের ভূমিকা ছিল
– এ উপমহাদেশে কংগ্রেসের প্রতিদ্বন্দ্বী আরেকটি রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন ছিল- এবং
– হিন্দু ও মুসলিমকে বিভক্ত করাও প্রয়োজন ছিল; বেশীদিন এখানে তাদের শাসন-নির্যাতনের রাজত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদেই।

আমার “বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে মুসলমান” শীর্ষক পোস্টে বঙ্গভঙ্গের উদ্দেশ্য সম্পর্কে লিখেছিলামঃ

মঙ্গলবার, ১০ জানুয়ারি, ২০১৭

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে মুসলমান

 [ত্রিভুজদের মাঝেমধ্যেই বলতে দেখা যায়- রবীন্দ্রনাথ যেহেতু বঙ্গভঙ্গের বিরোধীতা করেছিলেন, সেহেতু তিনি পূর্ববঙ্গের তথা বংলাদেশ চেতনারই বিরোধী মানুষ ছিলেন। সেখান থেকে সিদ্ধান্ত, বঙ্গভঙ্গ বিরোধী অবস্থান থেকে লেখা আমার সোনার বাংলা গানটিও বাংলাদেশের চেতনার সাথেই বিরোধাত্মক! সব মিলিয়ে অনেককেই বলতে দেখা যায়- বঙ্গভঙ্গ পূর্ববঙ্গের স্বার্থেই ব্রিটিশ-রাজ করেছিল এবং এই বঙ্গভঙ্গের বিরোধীতা করা মানেই পূর্ববঙ্গের উন্নতি না চাওয়া।  সামহোয়াইনব্লগে বিবর্তনবাদীর 'বঙ্গভঙ্গ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট' শীর্ষক পোস্টে এ বিষয়ে বেশ কিছু আলোচনা করেছিলাম। মুসলমানরাও যে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছিলেন- সে ইতিহাসই এই পোস্টে তুলে ধরার চেস্টা করেছি।]

বঙ্গভঙ্গঃ ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলেও এর ইতিহাস আরেকটু আগের। ১৮৭৪ সালে আসামকে বাংলার থেকে বিচ্ছিন্ন করে পৃথক প্রদেশ গড়ে তোলা হয়। তখনই কাছাড়-গোয়ালপাড়া-শ্রীহট্ট বাংলা ভাষভাষী এই তিন জেলাকেও আসামের সাথে জুড়ে দেয়া হয়। এর আগে আসাম ‘বঙ্গ’ বা ‘বাঙলা’ প্রেসিডেন্সির অংশ ছিলো। ১৮৭৪ এর পরে ‘বঙ্গ’ প্রেসিডেন্সির অংশ ছিলো বাঙলা, বিহার, উড়িষ্যা ও ছোটনাগপুর। আয়তন ১,৯০,০০০ বর্গমাইল ও লোকসংখ্যা ৭ কোটি ৮ লক্ষ ৫০ হাজার। ১৮৯১ সালে কয়েকজন উচ্চপদস্থ আমলা এই প্রস্তাব করলেন যে, লুশাই পাহাড়-অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম বিভাগ আসামের সঙ্গে মিশে যাওয়া উচিত। ১৮৯২ তে এই সংযোগ সরকার বাহাদুর মেনে নিলেন; কিন্তু আমাদের ততকালীন চিফ কমশনার স্যার উইলিয়াম ওয়ার্ড ১৮৯৬ সালে ঢাকা বিভাগকেও আসামের অংশ করতে চাইলেন, চাইলেন ময়মনসিংহকেও। আর্থিক, বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক সুবিধার ধুয়া তুলে এই সংযোগের প্রস্তাব করা হলেও তাঁর দুরভিসন্ধি মানুষ ধরতে পারে এবং প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রবল গণবিক্ষোভ শুরু হয়ে যায়, ফলে ওয়ার্ড সাহেব পিছু হটতে বাধ্য হন। ১৯০৩ সালে বাংলার ছোটলাট অ্যানড্রু ফ্রেজার বাংলাভাগের নতুন একটা খসড়া প্রস্তাব আনেন। তদানীন্তন স্বরাষ্ট্রসচিব রিজলি’র মাধ্যমে পেশকৃত প্রস্তাবটিতে (রিজলির পরিকল্পনা বা পত্র নামে খ্যাত) চট্টগ্রাম বিভাগ, ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলাকে আসামের সাথে যুক্ত হওয়ার কথাই বলা হয়। এটিও দিনের আলোয় আসার সাথে সাথেই চারদিকে প্রবল আলোড়ন শুরু হয়ে যায় এবং সরকার বাধ্য হয় পিছিয়ে যেতে। এবারে পরিকল্পনাটিকে ঢেলে সাজানো হয়। নতুন পরিকল্পনায় স্থির হয়-ঢাকা বিভাগ, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগ এবং পার্বত্য ত্রিপুরা, মালদহ জেলা ও দার্জিলিং, অর্থাত উত্তরবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গকে আসামের সাথে যুক্ত করে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ নামে একটি প্রদেশ গড়ে তোলা হবে, এই প্রদেশের রাজধানী হবে ঢাকা। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্বয়ং লর্ড কার্জন মাঠে নামেন- ঢাকায় এসে মুসলমানদের বুঝানো আরম্ভ করেন- এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে মুসলমানদের জন্য কত ভালো হবে। অনেক প্রতিবাদের মুখেও অবশেষে ১৯০৫ সালে অক্টোবরে বাঙলা ভাগ কার্যকর করা হয়।
 
বঙ্গভঙ্গের উদ্দেশ্যঃ বাঙলাদেশ, বিহার ও উড়িষ্যার একটি প্রদেশ হিসাবে থাকার প্রশাসনিক দিক থেকে অনেক অসুবিধা ছিলো একথা সত্য। কাজেই সেই বিশাল প্রদেশকে ভেঙ্গে দিয়ে নতুনভাবে গঠন করা কোনো দোষের ব্যাপার ছিলো না। বৃটিশ ভারতীয় সরকার প্রধানত এই কারণটিকেই বঙ্গভঙ্গের মূল যুক্তি হিসাবে উপস্থিত করেছিলো। কিন্তু প্রদেশ পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা সত্ত্বেও সেটাই যে বঙ্গভঙ্গের মূল কারণ ছিলো না তা বৃটিশ সরকার ও বৃটিশ ভারতীয় সরকারের বিভিন্ন নীতি, সরকারী ভাষ্য এবং দলিলপত্র থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমানিত হয়। বঙ্গ বিভাগের আসল কারণ ছিলো রাজনৈতিক। রিজলির নোটে আমরা দেখি,
“ঐক্যবদ্ধ বাঙলা একটি শক্তি। …. আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য হলো তাকে বিভক্ত করা এবং এভাবে আমাদের শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ বিরুধীদের দুর্বল করে তোলা”।
১৯০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা সফরের সময় লর্ড কার্জন খুব পরিস্কারভাবে বলেন,
“বাঙালীরা যারা নিজেদেরকে একটি জাতি হিসাবে চিন্তা করতে ভালোবাসে এবং যারা এমন এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে যেখানে ইংরেজদেরকে বিতাড়িত করে একজন বাঙালী বাবু কলকাতার গভর্মেন্ট হাউজে অধিষ্ঠিত হবে, তারা অবশ্যই সেই ধরণের যেকোন ভাঙ্গনের বিরুদ্ধে তিক্ত মনোভাব পোষণ করে যা তাদের এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে বাঁধাস্বরূপ। এখন তাদের চিতকারের কাছে নতি স্বীকার করার মত দুর্বল হয়ে পড়লে আমরা আর কখনো বাঙলাকে বিভক্ত অথবা ছোট করতে সক্ষম হবো না এবং তার দ্বারা আপনারা ভারতের পূর্বদিকে এমন একটা শক্তিকে জমাটবদ্ধ ও কঠিন করবেন যে শক্তি ইতোমধ্যেই অপ্রতিরোধ্য হয়েছে এবং যা ভবিষ্যতে ক্রমবর্ধমান বিশৃঙ্খলার নিশ্চিত উৎস হিসেবে বিরাজ করবে”।

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে মুসলমানঃ নবাব সলিমুল্লাহকে দিয়ে শুরু করি। কেননা, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে তিনি ছিলেন ইংরেজদের পক্ষে। কিন্তু প্রথম দিকে তিনিও বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব মেনে নেননি। ১১ জানুয়ারি ১৯০৪ নবাব সলিমুল্লাহ একটি সভা ডাকেন, এখানে তিনি ও অন্যান্যরা সরকারের তীব্র বিরোধীতা করেন- এমনকি এই প্রস্তাবকে Besatly বলতেও তিনি দ্বিধা করেননি। ‘দ্য মুসলিম ক্রনিকল’ পত্রিকা এক সম্পাদকীয়তে(জানুয়ারি ১৯০৪) স্বীকার করেছে যে, “জনগণ- সম্পর্কিত কোনও বিষয়ে দেশবাসী এতখানি ঐক্যবদ্ধ আগে কখনও হয়নি, যতটা প্রস্তাবিত বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে হয়েছে” ১৭ জানুয়ারি ১৯০৪ ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত এক বঙ্গভঙ্গ বিরোধী সভায় উপস্থিত ৮০০০ শ্রোতার ৭৭০০ জনই ছিলো মুসলমান (অবশ্য এ সভায় উপস্থিত হওয়ার পেছনে অভিজাত হিন্দুদের চাপ প্রয়োগের অভিযোগ আছে)। ২৫ জানুয়ারি ১৯০৪ মহমেডান ফ্রেণ্ডস ইউনিয়ন অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে ঢাকায় এক জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জমিদার কায়েসউদ্দিন আহমদ সিদ্দিকী। ১৯০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে কলকাতায় আয়োজিত সেন্ট্রাল মহমেডান অ্যাসোসিয়েশনের সভায় মৌলবি শামসুল হুদা ও মৌলবি সিরাজুল ইসলাম প্রস্তাবিত বঙ্গভঙ্গের তীব্র বিরোধীতা করেন। শামসুল হুদা দাবি করেন,

“মুসলিম সংগঠনগুলির ততখানি জোরের সঙ্গে প্রতিবাদ করা উচিত যতটা হিন্দু সংগঠন গুলি করছে, কারণ এতে হিন্দু-মুসলমান উভয়ের স্বার্থ জড়িত”।

সেন্ট্রাল মহমেডান অসোসিয়েশনের সম্পাদক আমির হোসেন সংস্থার পক্ষে ১৯০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সরকারকে একটি চিঠি লিখে জানান,

“বাঙালি জাতির কোন অংশকে বাঙলা থেকে আলাদা করা উচিত হবে না,…… যদি প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোই বিভাজনের উদ্দেশ্য হয় তাহলে সমগ্র বাঙলাকে মাদ্রাজ এবং বোম্বাইয়ের মতো নির্বাহী পরিষদ (Executive Council) গঠন করে গভর্ণরের শাসনাধীনে আনা হোক”।

মুনতাসীর মামুন কর্তৃক সংকলিত “উনিশ শতকে বাংলাদেশের সংবাদ-সাময়িকপত্র” গ্রন্থের অষ্টম খণ্ডে আমরা দেখি- ‘ঢাকা প্রকাশ’ পত্রিকাটির অবস্থান ছিলো স্বাভাবিকভাবেই বঙ্গভঙ্গের বিপক্ষে। ১৯০৪ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ‘বেঙ্গল টাইমস’ (পূর্ববঙ্গ থেকে প্রকাশিত প্রথম ইংরেজী সাপ্তাহিক ও পরে দৈনিক) -এও অবিশ্রান্তভাবে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। যদিও ‘বেঙ্গল টাইমস’ অতীতে সবসময় নবাব পরিবারের পক্ষাবলম্বন করেছে, কিন্তু বঙ্গভঙ্গের বেলায় নবাব সলিমুল্লাহর পথ অনুসরণ করেনি ওই পত্রিকা। ৪ জানুয়ারি ১৯০৪, ঢাকার সদরঘাটের এক সভায় সভাপতিত্ব করেন একজন মুসলমান জমিদার। সভাতে যে আটাশজন প্রতিনিধি নির্বাচিত হন বঙ্গভঙ্গের সরকারি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অন্যান্য জেলার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার জন্য, তার মধ্যে ৭ জন মুসলমান, ৪ জন ইঙ্গ-ভারতীয় এবং বাকিরা ছিলেন হিন্দু। নারায়নগঞ্জের এক জনসভায় বিভিন্ন প্রস্তাবের উত্থাপক ও সমর্থকের মধ্যে বেশ কয়েকজনই ছিলেন মুসলমান। ফেব্রুয়ারি ১৯০৪ এ লর্ড কার্জন ঢাকা সফরে মুসলমানদের নানাভাবে প্রলুব্ধ করার চেস্টা করলেও তাঁর ফিরে যাওয়ার ঠিক পরেই, মার্চ মাসে, ঢাকার জগন্নাথ কলেজে হিন্দু-মুসলমানের এক যৌথ সমাবেশ হয় এবং তাতে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয় এই মর্মে যে, “ভাইসরয়ের মিষ্টি কথাতে জেলার জনগণের মন ভোলেনি” ২৭ অক্টোবর ১৯০৫ ‘ছোলতান’ পত্রিকায় একটি সংবাদে প্রকাশ, “কলকাতার মুসলমানের বেশিরভাগই ছিলেন স্বদেশি আন্দোলনের সমর্থক, শুধু কয়েকজন রাজনৈতিক কাণ্ডজ্ঞানহীন মুসলমান বাদে, যারা অন্যদের স্বদেশি আন্দোলনে যোগ দিতে বাঁধা দিচ্ছিলেন”স্বদেশি আন্দোলনে মুসলিম অংশগ্রহণের সাক্ষ্য হিসাবে কিছু মুসলমান নেতার নাম বিভিন্ন আলোচনায় ঘুরে ফিরে আসে। এঁদের একজন হলেন খাজা আতিকুল্লাহ- নবাব সলিমুল্লাহর বৈমাত্রেয় ভাই, তিনি ছিলেন বঙ্গভঙ্গের প্রবল বিরোধী। ডিসেম্বর ১৯০৬ কলকাতায় কংগ্রেস অধিবেশনে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রস্তাব উত্থাপন করেন খাজা আতিকুল্লাহ। ওই প্রসঙ্গে তিনি বলেন,

“পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা সকলেই বঙ্গভঙ্গের পক্ষে একথা ঠিক নয়। কিছু ধনী মুসলমান নিজেদের স্বার্থে সরকারের এই পদক্ষেপ সমর্থন করছে”।

নিজের পরিবার সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য ছিলো,

“নবাব সলিমুল্লাহর মত গোটা খাজা পরিবারের মত নয়। এই পরিবারের অন্যরা বঙ্গভঙ্গকে হিন্দু-মুসলমান উভয়ের প্রতি অবিচার বলে মনে করেন এবং চান যে তা রদ হোক”।

প্রসঙ্গত, এই সভায় আতিকুল্লাহ ছাড়াও ঢাকা নবাব বাড়ির আরো কিছু সদস্য উপস্থিত ছিলেন। মুসলমানদের মধ্যে অন্যান্যরা যাঁরা বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য-
* সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মহমেডান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খান বাহাদুর মহম্মদ ইউসুফ- ১৯০৬ সালে ফেডারেশন হলের সভায় সভাপতিত্ব করার জন্য ঐ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেয়া হয়,
* বরিশালের জমিদার সৈয়দ মোতাহার হোসেন- বঙ্গভঙ্গ-রদের আন্দোলনের বর্ষপূর্তির সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন,
* ফরিদপুরের উকিল আলীমুজ্জামান চৌধুরী- ১৯০৭ সালে নিজের জেলার এক হাজার মুসলমানের সইসহ বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে এক স্মারকলিপি পেশ করেছিলেন,
* বর্ধমান জেলার কংগ্রেস নেতা আবুল কাসেম,
* কলকাতার আইনজীবী ও টাঙ্গাইলের জমিদার আবদুল হালিম গজনভি,
* ব্যরিস্টার আবদুল রসুল- হালিম ও রসুল মিলে মুসলিম লীগ বিরোধী ‘বেঙ্গল মহমেডান অ্যাসোসিয়েশন’ গঠন করেন,
* যশোরের স্বদেশি নেতা দীন মহম্মদ,
* ‘দ্য মুসলমান’ পত্রিকার সম্পাদক মুজিবর রহমান,
* মৌলবি কাজেম আলি মাস্টার,
* মৌলানা মহম্মদ আকরাম খাঁ- আজাদ পত্রিকার সম্পাদক ও মালিক,
* পাটনার আলি ইমাম ও তার সহোদর হাসান ইমাম,
* ব্যারিস্টার মজহারুল হক- সাদাকত আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা,
* মৌলানা আবুল কালাম আজাদ,
* কলকাতার শিক্ষক দেদার বক্স- স্বদেশি আন্দোলনের বক্তা হিসাবে খ্যাতিলাভ করেছিলেন,
* ঢাকার শিক্ষক হেদায়েত বক্স, স্বদেশি প্রচারক দেদার বক্স ও ‘ছোলতান’ পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য মৌলবি মনিরুজ্জামান ইসলামবাদি- স্বদেশি আন্দোলনে এই তিনজনেরও বক্তা হিসাবে সুনাম ছিলো,
* কবি সৈয়দ আবু মহম্মদ ইসমাইল হোসেন সিরাজী- স্বদেশি করতে গিয়ে নিজের সম্প্রদায়ের মানুষের হাতে লাঞ্ছিত হন,
* অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটির সক্রিয় সদস্য লিয়াকত হোসেন,
* হুগলির আবুল হোসেন এবং ‘হাবলুল মতীন’ পত্রিকার সম্পাদক প্রাক্তন ফারসি শিক্ষক আবদুল গফুর- দুই বাঙলায় এঁরা বিভিন্ন সভায় বক্তৃতা করেন।…… প্রমুখ।
১৯০৭ সালের গোড়ায় যে স্মারকলিপি পেশ করেন আলিমুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর সহ-স্বাক্ষরকারী খানপাড়ার জমিদার রহমতজান চৌধুরি, তাতে তাঁরা বলেন,

“সরকার যদি চাকরি-বাকরির ব্যাপারে বিশেষ কিছু সুবিধা দিতে চায় মুসলমানদের তাহলে সেটা বাঙলা ভাগ না করেও দেওয়া যেত”।

১৯০৭ সালের এপ্রিল মাসে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে এক বিশাল জনসভা হয় দক্ষিণ মালদায়। তাতে শ্রোতাদের অর্ধেকই ছিলেন মুসলমান। মৌলবি মুহম্মদ সালেহ এই সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং এর প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন বিশ্বনাথপুরের মুন্সি মুহম্মদ গুলজার। ১৯০৭ সালের অক্টোবর শেষ সপ্তাহে খুলনা জেলার সেনহাটিতে ঐ রকম একটি সভা হয়েছিলো প্রায় পুরোপুরি মুসলিম উদ্যোগে। শুধু অবস্থাপন্নই নন, অনেক মুসলমান চাষীও এই সভায় যোগ দিয়েছিলেন। এমন আরো অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

উপসংহারঃ তবে এটা ঠিক, এ বঙ্গের অধিকাংশ মুসলমানই পরবর্তিতে বঙ্গভঙ্গের পক্ষে অবস্থান নেন। কারণ কি? হিন্দুদের তুলনায় পশ্চাদপদ মুসলমানরা মনে করেছিলো এতে তাদের সমূহ উন্নতি সম্ভব- এবং এ প্রলোভনটিই প্রথম থেকে ব্রিটিশরা মুসলমানদের দিয়ে এসেছে। ১৯০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা সফরে লর্ড কার্জন বলেন,

“বঙ্গভঙ্গ পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের মধ্যে এমন এক নতুন ঐক্য আনবে যা মুসলমান শাসকদের আমলেও তাঁরা পাননি”।

বাস্তবিকই এসময় ব্রিটিশদের কিছু উদ্যোগ দেখা যায়। বঙ্গভঙ্গের ঠিক পরেই পাট চাষে কৃষকরা লাভবান হন। এবং পরীক্ষামূলকভাবে বর্গা বা আধিয়ারি আইন প্রচলিত হওয়ায় কৃষকরা জমিদারের খাস জমিতে বর্গাচাষি হিসাবে স্বীকৃতি পেতে লাগলেন। শুধু ঢাকা জেলাতেই ৭০ হাজার কৃষক খাসজমির প্রজা হিসাবে নিজেদের নাম তালিকাভুক্ত করতে পেরেছিলেন। (অথচ- এই ইংরেজ সরকারই একদিন চিরস্থায়ি বন্দোবস্তের মাধ্যমে- কৃষকদের জমি থেকে উতখাত করেছিলো!!), একে বঙ্গভঙ্গের সুফল মনে করে মুসলমান কৃষকরাও বঙ্গভঙ্গ সমর্থন করতে আরম্ভ করেন। পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের নতুন গভর্ণর স্যার ব্যামফিল্ড ফুলার মুসলমানদের উন্নতির জন্য বিশেষ নজর দেন, এতে কিছু পরিবর্তনও খুব তাড়াতাড়ি ধরা পড়ে- যার মধ্যে মুসলমানদের শিক্ষা অন্যতম। ফুলার বলেছিলেন,

“হিন্দু-মুসলমান তাঁর দুই স্ত্রী এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রতিই টান বেশি তাঁর”।

ব্রিটিশ সরকার এপর্বে নানাভাবে মুসলমান তোষণ চালিয়ে যেতে থাকে, নতুন প্রশাসনে মুসলমান ও হিন্দুর অনুপাত ২:১ রাখার ঘোষণা দেয়া হয়। নবাব সলিমুল্লাহর অবদানও কম নয়- বঙ্গভঙ্গের পক্ষে মুসলমানদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে। ঢাকায় নবাব সলিমুল্লাহকে দেনার দায় থেকে বাঁচাতে ১৪ লক্ষ টাকা ঋণ দেয়া হয় সরকারি কোষাগার থেকে। কেননা, বৃটিশ সরকারের একথা অজানা ছিলো না যে, পূর্ববঙ্গের অভিজাত মুসলমান সম্প্রদায় এবং মুসলমান তালুকদার-ধনী কৃষক গোষ্ঠীর ওপরে নবাব সলিমুল্লাহর যথেস্ট প্রভাব আছে। নবাব সলিমুল্লাহর মদতপুষ্ট প্রচারকরা প্রচার করতে থাকে যে, নতুন গঠিত হওয়া প্রদেশটিতে মুসলমান কৃষকদের কোন রাজস্ব দিতে হবে না এবং বৃটিশদের শেষ হয়ে ইসলামের পুনরুত্থান আসন্ন, যে ইসলামি শাসনের কর্ণধার হবেন নবাব সলিমুল্লাহ।

অথচ, অসংখ্য আত্মমর্যাদাশীল মুসলিম নেতাই এভাবে উপঢৌকন নিয়ে বিভক্ত হয়ে উন্নত হতে আপত্তি জানিয়েছিলেন- বলেছিলেন-

“পিছিয়ে পড়া অবহেলিত অংশ হিসাবে আমাদের উন্নতিতে সরকারের বিশেষ দৃষ্টি অবশ্যই যৌক্তিক ও এটা আমাদের ন্যায্য দাবিও, কিন্তু এহেন ঐতিহাসিক ক্ষণে বঙ্গমাতাকে দ্বিখণ্ডিত করার লক্ষে আমাদেরকে দাবার বড়ে হিসাবে ব্যবহৃত করতে- যতই আমাদের উন্নতি করা হোক না কেন- আমরা কি সেই উন্নতিকে সমর্থন জানাতে পারি? কেননা এতে যে ইতিহাসে আমরা মাতার অঙ্গচ্ছেদকারির তল্পিবাহক হিসাবেই চিহ্নিত হবো!”

প্রশ্নঃ যেসব মুসলমান বঙ্গভঙ্গের বিরোধীতা করেছিলেন- তাঁরাও কি বাঙলাদেশ চেতনার বিরোধী?

সূত্রঃ
১। বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি- বদরুদ্দীন উমর,
২। বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধ আন্দোলন- শতবর্ষ স্মারক সংগ্রহ,
৩। উনিশ শতকে বাংলাদেশের সংবাদ-সাময়িকপত্র (অষ্টম খণ্ড)- মুনতাসীর মামুন সংকলিত,
৪। Swadeshi Movement in Bengal- Sumit Sarkar,
৫। উপনিবেশপূর্ব বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতি – গোলাম রব্বানী,
৬। Bengal divided- জয়া চ্যাটার্জি

প্রথম প্রকাশঃ তারিখ: সামহোয়ারইন ব্লগ, ০২ , ২০০৮ 

দ্বিতীয় প্রকাশঃ  মুক্তমনা ব্লগ, জানুয়ারি ১০, ২০১৭

[সামহোয়ারইনব্লগে "ত্রিভুজ"  আইডি সহ বেশ কিছু জামাতী পেইড ব্লগার মাঝে মধ্যেই আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস নিয়ে নানা রকম সাম্প্রদায়িক বক্তব্য প্রদান করতো, যেখানে খুব আলোচিত ও বিতর্কিত ("হট") টপিকগুলো মধ্যে ছিলঃ “হিন্দু রবীন্দ্রনাথ", "হিন্দুয়ানি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি” প্রভৃতি। যেহেতু তাদের এসব আলাপে, তার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের পরতে পরতে সাম্প্রদায়িকতার একটা প্রলেপ থাকতো  চটকদারি বিভিন্ন যুক্তি-ব্যাখ্যার মোড়কে, সেহেতু অনেক শিক্ষিত ব্লগারও বিভ্রান্ত হয়ে যেত! ঐ সময়ে ত্রিভুজ গোষ্ঠীর সাথে আমরা অনেকেই অনেক তর্ক-বিতর্ক করেছিলাম। ইদানিং ত্রিভুজ গোষ্ঠীর বক্তব্য ও ভাষা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হুজুরের ওয়াজে স্থান পাওয়ায় এসব বিষয় নিয়ে আবারও আলাপ আলোচনা শুরু হয়েছে বিধায় পুরাতন কয়েকটি লেখাকে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।]

শেরে বাংলা এবং সাতচল্লিশের দেশভাগে প্রগতিশীল মুসলিম বাঙালির ভূমিকা

নাস্তিক ব্লগার ও লেখক সুষুপ্ত পাঠক তার এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে সাতচল্লিশের দেশভাগের পুরো দায় "প্রগতিশীল মুসলমান বাঙালির উপরে দিয়ে বলেছেন,
"মুসলমান পরিচয়ে দেশভাগ করেছিল যে ‘প্রগতিশীল মুসলমান বাঙালীরা’- তারাই সুযোগ পেলে রবীন্দ্রনাথকে সাম্প্রদায়িক প্রমাণ করতে চেয়েছে সব সময়। ফয়জুল করীম বাংলা সাহিত্যের ধার ধারেন না। মাদ্রাসায় লেখাপড়া করে রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করেছিলেন- এরকম ইতিহাস জানার সুযোগ তার নেই। এই ইতিহাস যারা সৃষ্টি করেছে তারাই ৪৭ সালে দেশভাগ করেছিল। লাহোর প্রস্তাব অর্থাৎ হিন্দুদের খেদিয়ে শুধু মুসলমানদের নিয়ে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের দাবী যারা করেছিল তারা কেউ মোল্লা-মুন্সি ছিল না। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক সাহেবকে তো আর মুফতী ফয়জুল করীমের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না- তাই না? এটা তো কেউ অস্বীকার করতে পারবে না- পূর্ববঙ্গকে খাৎনা যারা করেছিলেন তারা কেউই পীর-মাশায়েক মুফতি-মাওলানা ছিলেন না"!
সুষুপ্ত পাঠকের এই আলোচনার সাথে একমত পোষণ করা কঠিন। দ্বিমতের মূল জায়গাগুলো হচ্ছেঃ
 
প্রথমত, মুসলিম পরিচয়ে দেশভাগ করেছিল প্রগতিশীল মুসলমান বাঙালিরা- এ কথা সঠিক নয়। ৪৭ এর দেশভাগের দায় এদের আছে, কিন্তু সেটি প্রধান নয়। বরং ৪৭ এর দেশভাগে প্রগতিশীল মুসলিম বাঙালির একটি বড় অংশ বিরোধিতা করেন।
দ্বিতীয়ত, লাহোর প্রস্তাবের কোথাও হিন্দুদের খেদিয়ে শুধুমাত্র মুসলমানদের নিয়ে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব ছিল না। লাহোর প্রস্তাবে ছিল- মুসলমান সংখাগরিষ্ঠ অঞ্চলে স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ গঠিত হবে- যেগুলো হবে স্বায়ত্বশাসিত ও সার্বভৌম। লাহোর প্রস্তাবে এমনকি "পাকিস্তান" নামও ছিল না। পাকিস্তান থেকে হিন্দু খেদানো বা হিন্দুস্তান (ভারত) থেকে মুসলমান খেদানোর অনুষঙ্গ আরো পরের ঘটনা- ১৯৪৬ এর দাঙ্গার মাধ্যমে এর সূচনা বলা যায়। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলকে একটি একক স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রস্তাবনা ১৯৪১ সালের লাহোর প্রস্তাবের না- এটি ১৯৪৬ সালে সোহরাওয়ার্দী উত্থাপন করেন।
তৃতীয়ত, লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনকারী হিসেবে কিছুটা দায় অবশ্যই শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের আছে- কিন্তু সম্পূর্ণ দায় এককভাবে তার নয়, বিশেষ করে ১৯৩৭ পরবর্তী সময়ে বাংলার রাজনীতিতে কিভাবে মুসলিম লীগের রাজনীতি জাঁকিয়ে বসলো, কোন পরিস্থিতিতে কৃষক প্রজা পার্টি থেকে নির্বাচিত মূখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা মুসলিম লীগের কাছে নতজানু হতে বাধ্য হলেন সেইসব ইতিহাস যদি জানা থাকে কিংবা ১৯৪২ সাল থেকেই তীব্রভাবে দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধিতা করার ইতিহাসটিও যদি জানা থাকে- আশা করি- শেরে বাংলাকে নিয়ে অন্তত এই বিষয়ে এভাবে অশ্রদ্ধাসূচক কথা বলা সম্ভব নয়!
 
প্রথম ও দ্বিতীয় পয়েন্টে আলাপ করা ছোট পরিসরে সম্ভব নয়, সময় সুযোগও কম, তাই তৃতীয় পয়েন্টেই কিছুটা ইতিহাস তুলে ধরছি।
শেরে বাংলার পুরো রাজনৈতিক জীবনের ইতিহাস দারুণ বৈচিত্র্যময়। তিনি একই সাথে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস করেছেন, নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি- কৃষক প্রজা পার্টি নামে পার্টিও তৈরি করেছেন। মুসলিম লীগের বঙ্গীয় সাধারণ সম্পাদক, সভাপতি, নিখিল ভারত মুসলিম লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি, কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯১৩ সাল থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত বঙ্গীয় আইন পরিষদের সাথে জড়িত ছিলেন (মাঝে দুবছর কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের সদস্য ছিলেন), ১৯২৪ সালে অবিভক্ত বাংলার শিক্ষামন্ত্রী, কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র হন, ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলার মূখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন। যেহেতু লাহোর প্রস্তাবের ঘটনাটি এই সময়কালের, সেহেতু ১৯৩৭ সালের নির্বাচন থেকেই ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিচ্ছি।
১৯৩৭ সালের নির্বাচনে শেরে বাংলা অংশ নেন তার কৃষক প্রজা পার্টির পক্ষ থেকে। এই নির্বাচনে শেরে বাংলার কৃষক প্রজা পার্টি বাংলায় ১১৯ আসনের মধ্যে ৪৩ আসন লাভ করেন, মুসলিম লীগ ৩৮ টি। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় কোয়ালিশন সরকার গঠনের প্রয়োজন পড়ে। শেরে বাংলার আগ্রহ ছিল- কংগ্রেসের সাথে এই কোয়ালিশন গড়া। কিন্তু কিংগ্রেস রাজী না হওয়ায় শেরে বাংলা বাধ্য হয় মুসলিম লীগের সাথে কোয়ালিশন সরকার গড়তে। জিন্নাহ যেন এর অপেক্ষাতেই ছিলেন। কেননা, পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে প্রবলভাবে দাঁড়িয়ে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করেই কৃষক প্রজা পার্টি প্রধান দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল।
১৯৩৪ সালে এম.এ জিন্নাহ মুসলিম লীগের সভাপতি হওয়ার পরে মুসলিম লীগের কর্মসূচিতে শেরে বাংলা সন্তুষ্ট ছিলেন না, জিন্নাহর সঙ্গে তার পার্থক্য তীব্রতর হয়ে ওঠে। ১৯৩৬ সালে ফজলুল হক তাঁর নির্বাচনী ইশতেহারের খসড়া তৈরি করেন এবং তাঁর নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় তিনি জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি জনগোষ্ঠীর সকল অংশ নিয়ে এক নতুন বাংলা গড়তে চেয়েছিলেন তাঁর নির্বাচনী ইশতেহারে, যা মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। এই বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ্য! এবং সলিমুল্লাহর হাতে- এই পূর্ববঙ্গে গড়া মুসলিম লীগ কিন্তু অপেক্ষাকৃত নবীন পার্টির কাছে পরাজিত হয়। খাজা নাজিমুদ্দিনের বিপরীতে আড়াই গুণ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। ফলে, ভোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এতটুকু আমরা বলতে পারি - ১৯৩৭ সালেও পূর্ববঙ্গের মানুষ সকল জনগোষ্ঠীর বাংলা চেয়েছিল। মাত্র ৩ বছরের মাথায় জিন্নাহর দ্বিজাতি-তত্ত্বের ভিত্তিতে লাহোর প্রস্তাব পূর্ব বঙ্গের মুসলমান জনগণের মধ্যে ভীষণ জনপ্রিয় হয় এবং দ্রুতই প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়, কিন্তু এতে শেরে বাংলার অবদান- কেবল ঐ লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন পর্যন্তই, কেননা ১৯৪২ থেকেই এর বিরোধিতা করার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে তার কৃষক প্রজা পার্টি মুসলিম লীগের বিপরীতে দ্রুত জনপ্রিয়তা হারাতে হারাতে ১৯৪৬ এর নির্বাচনে মুসলিম লীগ জয়লাভ করে সোহরাওয়ার্দী মূখ্যমন্ত্রী হিসেবে সরকার গঠন করেন।
১৯৩৭ থেকে ১৯৪১ পর্যন্ত মূখ্যমন্ত্রী হিসেবে শেরে বাংলা বাস্তবে তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করেন। শুরুতেই কংগ্রেসের পরিবর্তে মুসলিম লীগের সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠন, তাকে কোনঠাসা করে ফেলে। কৃষক প্রজা পার্টি জোর দিয়েছিল ভূমি সম্বন্ধীয় মৌলিক সংস্কারের, মুসলিম লীগের চাইতে কংগ্রেস ছিল সহায়ক, কেননা মুসলিম লীগ ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার বিলোপের বিরুদ্ধে; এছাড়া সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মনোভাবের দিক দিয়েও কৃষক প্রজা পার্টি ও কংগ্রেস কাছাকাছি ছিল- এরকম বিবেচনার জায়গা থেকেই শেরে বাংলা কংগ্রেসের সাথে কোয়ালিশন করতে চেয়েছিল, কিন্তু কংগ্রেসের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অদূরদর্শিতার কারণে সেটি সম্ভব হলো না। এটি হচ্ছে, মুসলিম লীগের উপর সওয়ার হয়ে মুসলিম লীগকে আশ্রয় - প্রশ্রয় দেয়ার প্রথম ধাপ। এর মাঝে এই কোয়ালিশন সরকারের মাঝে নানা কলহ, দ্বন্দ্ব বিবাদ তো আছেই। বিরোদীদল কংগ্রেস তার রাজনৈতিক অপোনেন্ট মুসলিম লীগের বিরোধিতায় শেরে বাংলার সরকারকে সম্পূর্ণভাবেই অসহযোগিতার লাইন নেয়ায়, মুসলিম লীগের উপরে আরো নির্ভরশীল হতে হয়। প্রতিটি সুযোগ জিন্নাহ ও মুসলিম লীগের বঙ্গীয় নেতারা কাজে লাগায়। এর মধ্যে প্রজা পার্টির মধ্যেও কোন্দল শুরু হয়। সাধারণ সম্পাদক শামসুদ্দিন খানকে গভর্ণর তার ক্ষমতাবলে মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করলে এই কোন্দল চরমে ওঠে। মন্ত্রীসভার মুসলিম সদস্যদের মধ্যেও মুসলিম লীগের সদস্য সংখ্যা বেশি হওয়ায় শেরে বাংলা কোনঠাসা ছিলেন, এর মধ্যে বাজেট অধিবেশনে কৃষক প্রজা পার্টির কয়েকজন সদস্য শামসুদ্দিনের নেতৃত্বে বিরোধীদল কংগ্রেসের পক্ষে ভোট দিয়ে বসে। তারপরে- ২১ জন সদস্য পদত্যাগই করে বসে। এরপরে আইন প্রণয়নের জন্যে শেরে বাংলার মুসলিম লীগের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করা ছাড়া উপায়ই ছিল না। এমনকি- মুসলিম লীগের শর্ত মানতে দলত্যাগীদের ইসলাম বিরোধী বলে আখ্যা দিতেও হয় তাকে।
এমন পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেতে শেরে বাংলা আবার মরিয়া চেস্টা করেন- কংগ্রেসকে আবারো প্রস্তাব দেন- কোয়ালিশন গঠনে। কিন্তু কংগ্রেস আবারো ফিরিয়ে দেয়। এদিকে একে একে তার দলের নেতারা, কোয়ালিশনের অন্য সদস্যরাও মুখ ফিরিয়ে নিতে থাকে। এক পর্যায়ে এই সরকারে এক মুসলিম লীগ ছাড়া আর কেউ ছিল না, শেরে বাংলার পাশে। ফলে, শেরে বাংলাকে আবারো মুসলিম লীগের মতবাদ গ্রহণ করার ঘোষণা দিতে হয়। কৃষক প্রজা পার্টির নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ছাড়েন না, কিন্তু নেতা ছাড়া যেমন কৃষক প্রজা পার্টির ছন্নছাড়া অবস্থা হয়- তেমনি শেরে বাংলারও জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে থাকে।
মনে হতে পারে যে, মরিয়া হয়ে মুসলিম লীগকে আকড়ে ধরার কারণ হয়তো বা যেন তেন প্রকারে ক্ষমতা আকড়ে ধরার জন্যেই! মূখ্যমন্ত্রীত্বের লোভেই! কিন্তু ১৯৩৭ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত শেরে বাংলার সরকারের কিছু কাজের দিকে খেয়াল করা যায়ঃ প্রথম মন্ত্রিসভার আমলে (১৯৩৭-১৯৪১) হক কৃষকদের দুঃখকষ্ট মোচনের জন্য কিছু প্রশংসনীয় কাজ করেছিলেন। তিনি ‘Bengal Agricultural Debtors' Act’ (১৯৩৮) কার্যকর করে উচ্চহারে সুদ নেয় এমন মহাজনদের কবল থেকে দরিদ্র কৃষকদের রক্ষা করেন। তিনি বাংলার সব এলাকায় ঋণ সালিশি বোর্ডও স্থাপন করেছিলেন। ‘Money Lenders' Act’ (১৯৩৮) এবং ১৯৩৮ সালের ‘Bengal Tenancy (Amendment) Act’ কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটিয়েছিল। স্যার ফ্রান্সিস ফ্লাউডিকে সভাপতি করে ১৯৩৮ সালের ৫ নভেম্বর বাংলা সরকার কর্তৃক নিযুক্ত ‘ল্যান্ড রেভেনিউ কমিশন’ ১৯৪০ সালের ২১ মার্চ চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করে। এটি ছিল দেশের ভূমিব্যবস্থা সম্পর্কিত সবচেয়ে মূল্যবান দলিল। ১৯৩৮ সালের আইন দ্বারা ১৮৮৫ সালের প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন করা হয়েছিল এবং এর দ্বারা খাজনা বৃদ্ধির সকল ধারা দশ বছরের জন্য স্থগিত করা হয়েছিল। এটি রায়তদের উপর প্রথাগতভাবে জমিদারগণ কর্তৃক ধার্যকৃত সব ধরনের আবওয়াব ও সেলামির (কর) বিলোপ সাধন করে। জমিদারকে কোনো হস্তান্তর-ফি না দিয়ে রায়তরা তাদের জমি হস্তান্তর করার অধিকার লাভ করে। এ আইন বকেয়া খাজনার সুদের হার ১২.৫০% থেকে ৬.২৫%-এ হ্রাস করে। নদীর ভাঙ্গনে হারানোর ২০ বছরের মধ্যে চারবছরের খাজনা দিয়ে রায়তরা নদী-সিকস্তি (নদীর ভাঙনের ফলে লুপ্ত জমির পুন জেগে ওঠা) জমির মালিকানার অধিকার লাভ করে। হক তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার সময় জনগণকে প্রতিশ্রুত ডাল-ভাতের কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত করতে না পারলেও তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্বের প্রথম মেয়াদে কার্যকর রক্ষা বহু আইন কৃষকদের বোঝা কিছুটা লাঘব করতে সাহায্য করেছিল। এগুলো কোনকালেই মুসলিম লীগের এজেন্ডা ছিল না, আগ্রহও ছিল না। মন্ত্রীসভায় সম্পূর্ণ একা হয়ে এসব কাজ করতে শেরে বাংলাকে মূল্য কম দিতে হয়নি।
মুসলিম লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কার্যকর করতে শেরে বাংলাকে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হয়েছিলেন। এ মন্ত্রিসভার সুযোগ নিয়ে মুসলিম লীগ ধর্মীয় উপদলীয়তাকে উদ্দীপিত করে। ১৯৩৯ সাল নাগাদ তারা বাংলার শহর ও গ্রামাঞ্চলের সর্বত্রই তাদের প্রভাব বিস্তার করে। এ সময়ে জিন্নাহর সমর্থকদের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ মুসলমান জনসাধারণের রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। ব্যক্তিগত জীবনে ফজলুল হক ধর্মীয় উপদলীয়তা থেকে মুক্ত হলেও মন্ত্রিসভার কাজ চালাতে তাঁকে মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়েছিল। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য জিন্নাহ তাঁকে নির্বাচিত করেন। তীক্ষ্ণধীর অধিকারি জিন্নাহ তার কঠিন চালটি চালেন। পূর্ববঙ্গের বাঙালি মুসলমানের মধ্যে দ্রুত দ্বি-জাতি তত্ত্বকে ছড়িয়ে দিতে বাংলার মূখ্যমন্ত্রীর চাইতে ভালো অপশন আর কেউ ছিল না! ১৯৪১ সালে মুসলিম লীগের গঠনতন্ত্রের অংশ হয়ে যায় এই লাহোর প্রস্তাব। এর পর থেকে এটিই মুসলিম লীগের প্রধান রাজনৈতিক বক্তব্য। খুব দ্রুতই পূর্ববঙ্গের মুসলিম বাঙালির মাঝেও পাকিস্তান আন্দোলন খুব জনপ্রিয় হয়। এই জনপ্রিয় হওয়ার কারণ কেবল সাম্প্রদায়িকতা দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। বিস্তারিত ব্যাখ্যা অন্যত্র করা যাবেখন।
১৯৪১ সালে জিন্নাহর আপত্তির পরেও শেরে বাংলা ভাইসরয়ের প্রতিরক্ষা পরিষদে যোগদান করলে জিন্নাহ তাঁকে মুসলিম লীগ থেকে বহিষ্কার করে এবং কোয়ালিশন দল থেকে মুসলিম লীগকে প্রত্যাহার করে। ঠিক এর পরের ইতিহাসটির দিকে তাকালে কেবল আফসোসই বাড়ে। ১৯৪১ সালের ২ ডিসেম্বরে শেরে বাংলা পদত্যাগ করেন। এরপরে দেখা যায়, কংগ্রেস, ফরোয়ার্ড ব্লক সহ কৃষক প্রজা পার্টির দুই গ্রুপ মিলিতভাবে আবার কোয়ালিশন সরকার গঠন করে! যে কোয়ালিশন গঠনের জন্যে শেরে বাংলা ১৯৩৭ সালেই চেস্টা করেছিলেন, মাঝেও আরেকবার চেস্টা করেছিলেন- সেটি হলো দ্বিতীয় দফায়। ততদিনে বাস্তবে অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে। মুসলিম লীগ তখন বাংলার মুসলমানদের মধ্যে প্রভাব তৈরি করতে পেরেছে, শেরে বাংলার জনপ্রিয়তা অনেক হ্রাস পেয়েছে, পাকিস্তান আন্দোলন জনপ্রিয় হওয়া শুরু করেছে। ফলে, মুসলিম লীগ খুব সহজেই এই প্রচারণা দিতে পারলো- দ্বিতীয় কোয়ালিশন সরকার আদতে মুসলিম লীগ বিরোধী সরকার। তারপরেও কিছু কাজ করতে চেয়েছিল এই সরকার। কিন্তু প্রাদেশিক সরকার বাধ সাধে। প্রতি পদে পদে বাঁধার মধ্যে ১৯৪৩ সালে শেরে বাংলা আইনসভায় প্রকাশ্যে এ বিষয়ে বলে আরো বিরাগভাজন হন। ফলশ্রুতিতে গভর্ণরের উদ্যোগে দুবার অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়- সামান্য ব্যবধানে দুবারই প্রস্তাব নাকচ হয়ে গেলে- গভর্ণর ক্ষমতাবলে সরকারের শাসনভার নিজে হাতে নিয়ে নেয় এবং শেরে বাংলাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন।
মুসলিম লীগের কবল থেকে মুক্ত হওয়ার পর থেকেই ১৯৪২ সাল থেকে শেরে বাংলা তীব্রভাবে দ্বি-জাতি তত্ত্বের বিরোধিতায় লিপ্ত হন। ততদিনে বাস্তবে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। এই বিরোধিতা কেবল তাকেই জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন তথা মুসলিম লীগকে আরো জনপ্রিয়ই করে তুলেছে!